যুক্তরাষ্ট্র-ইরাক ৪৮টি চুক্তি সই: হরমুজ প্রণালির বিকল্প ইরাক-সিরিয়া তেল পাইপলাইন সচলের উদ্যোগ

ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মাঝে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বে আবদ্ধ হয়েছে ইরাক সরকার।
ওয়াশিংটনে ইরাকি প্রতিনিধি দলের সফরের পর মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে মোট ৪৮টি চুক্তি ও অংশীদারিত্ব ঘোষণাপত্র সই করেছে বাগদাদ। এই চুক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলো- পারস্য উপসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ এড়াতে দীর্ঘদিনের অচল ‘ইরাক-সিরিয়া তেল পাইপলাইন’ পুনর্নির্মাণ করা।
এই মেগা চুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ইরাক থেকে সিরিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পুরোনো তেল পাইপলাইনটি নতুন করে সংস্কার ও চালু করা।
বর্তমানে ইরাকের সিংহভাগ তেল পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি হয়ে বিশ্ববাজারে যায়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বা আঞ্চলিক যেকোনো দ্বন্দ্বে এই রুটটি বন্ধ হওয়ার স্থায়ী ঝুঁকি থাকে।
সিরিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরের পোর্টে সরাসরি তেল পৌঁছানোর এই রুটটি চালু হলে ইরাক অত্যন্ত নিরাপদ এবং কম সময়ে ইউরোপ ও পশ্চিমা বাজারে তেল রপ্তানি করতে পারবে।
এই পাইপলাইন পুনর্নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট কোম্পানিগুলো, যা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত করবে।
৪৮টি চুক্তির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ইরাকের বিদ্যুৎ বিপর্যয় দূর করা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। ইরাকের তেল খনিগুলো থেকে উত্তোলিত যে গ্যাস অপচয় বা পুড়িয়ে ফেলা হতো, মার্কিন প্রযুক্তির সাহায্যে তা ধরে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে ইরাকের ইরানের ওপর গ্যাসের নির্ভরশীলতা ব্যাপকভাবে কমবে।
ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে জেনারেল ইলেকট্রিকসহ বেশ কিছু মার্কিন টেকনিক্যাল কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।
জ্বালানি খাতের বাইরেও ইরাকের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো উন্নয়নে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত হচ্ছে। ইরাকের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রূপান্তর এবং অর্থ পাচার রোধে মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সই হয়েছে। ইরাকের অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস, সড়ক অবকাঠামো এবং সরকারি ডিজিটাল রূপান্তরে মার্কিন প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হবে।
এই ৪৮টি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে মার্কিন কোম্পানিগুলো ইরাকের জ্বালানি খাতে একচেটিয়া প্রবেশাধিকার পাচ্ছে, অন্যদিকে ইরাক তার প্রতিবেশী ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে পশ্চিমাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। হরমুজ প্রণালির বিকল্প এই পাইপলাইন প্রকল্পটি সফল হলে তা বৈশ্বিক তেল বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের একক আধিপত্যের সমীকরণ অনেকটাই বদলে দেবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

















