নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ৬২৬ জনের মৃত্যু, এখনো নিখোঁজ ২,৪২৬

নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। ২,৪২৬ জন এখনো নিখোঁজ থাকার খবর দিয়েছে কাঠমান্ডু পোস্ট। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে নেপালের সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, শনিবার সকাল ১০টায় প্রকাশিত কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়, ৪ হাজার ৪৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। আহত ১০১ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৭ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।
এখনো ২,৪২৬ জন নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বাড়ার আশঙ্কা করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অংশেও অন্তত ৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ভূতাত্ত্বিক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ২৬ আগস্ট সকালে নেপালের ল্যাংটাং অঞ্চলের প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতার একটি বিশাল হিমবাহ ধসে পড়ে। এই বরফ ও পাথরের স্তূপ ধসে নিচে নেমে লেন্ধে খোলা নদীর গতিপথকে প্রথমে অবরুদ্ধ করে ফেলে। পরে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া সেই অস্থায়ী বাঁধটি ভেঙে প্রায় ৯ মিটার উঁচু কাদা, পাথর ও বরফমিশ্রিত পানির একটি সুনামির মতো দানবীয় ঢেউ ভোটকোশী ও ত্রিশূলী নদীর উপত্যকা বেয়ে ধেয়ে আসে। এই তীব্র স্রোত নদীর অববাহিকায় থাকা ডজনখানেক জনবসতিকে মুহূর্তের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক এই বন্যার প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহগুলো নদীর নিম্ন অববাহিকায় কয়েকশো কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। নেপালে ৬২৬ জন এবং তিব্বতে ৭ জন। এমনকি স্রোতের টানে ভেসে আসা ৭টি মরদেহ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের উত্তর প্রদেশেও উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজ ২,৪২৬ জনের মধ্যে বড় একটি অংশই হলেন ওই অঞ্চলের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরত ৯৩৩ জন হাইড্রো-শ্রমিক। এছাড়া তিব্বতের পবিত্র কৈলাশ পর্বতে যাওয়ার পথে থাকা শত শত পুণ্যার্থী, পর্যটক এবং উদ্ধারকাজে নিয়োজিত ২৭ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
এখন পর্যন্ত ৪,৪৫১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং ১০১ জন গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নেপাল সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলো উপদ্রুত এলাকায় যৌথ অভিযান চালাচ্ছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে আটকে পড়াদের উদ্ধারে এবং জরুরি ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাতে সামরিক হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।
পাহাড়ি ধসে তিব্বত সীমান্তের সাথে সংযোগকারী প্রধান সড়ক ও বেশ কয়েকটি সেতু ধসে পড়েছে। ফলে উপদ্রুত জেলাগুলোতে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকারী দলগুলোর তথ্য আদান-প্রদানে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।
বন্যা ও কাদা ধসের তীব্রতার কারণে উদ্ধার হওয়া বহু মরদেহ চেনা যাচ্ছে না। নেপালের কাস্কি জেলার প্রধান জেলা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, বিভিন্ন জেলা থেকে অবিরাম মরদেহ আসছে। সমগ্র নেপাল জুড়ে মাত্র ৩৫০টি মরদেহ সংরক্ষণের সক্ষমতা থাকায় হাসপাতাল ও মর্গের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে লাশ সংরক্ষণের ফ্রিজার সহায়তার আবেদন জানিয়েছে
হিমালয় অঞ্চলের এই আকস্মিক দুর্যোগ নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। নিখোঁজদের উদ্ধার এবং বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষের পুনর্বাসনে নেপাল সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তার জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বন্যা ও ভূমিধসের ফলে চীন ও নেপালের মধ্যকার প্রধান বাণিজ্য পথ ও পর্যটন কেন্দ্র গাইরং পোর্ট কমপ্লেক্সটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। হিমালয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বিদ্যুৎ গ্রিড, সড়ক এবং সেতুগুলো নিশ্চিহ্ন হওয়ায় বহু পাহাড়ি এলাকা বর্তমানে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। নেপালের অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে দেশ পুনর্গঠনে অন্তত ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ফান্ডের প্রয়োজন।

















