মার্কিন বাণিজ্য তদন্তের মুখে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি সক্ষমতা ও বাণিজ্যের শর্তাবলি নিয়ে ওয়াশিংটনের শুরু করা এক বিশেষ তদন্তের তালিকায় পড়েছে বাংলাদেশ। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) কার্যালয় সম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে এই তদন্ত শুরু করেছে। মূলত উৎপাদন সক্ষমতা, সরকারি ভর্তুকি এবং শ্রম অধিকারের মতো সাতটি প্রধান মানদণ্ডকে কেন্দ্র করে এই তদন্ত চালানো হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের মালিকরা একে ‘অস্বস্তিকর’ বললেও বড় কোনো ঝুঁকির আশঙ্কা দেখছেন না।
মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, চীনসহ বেশ কিছু দেশ বিভিন্ন শিল্পে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা (Excess Capacity) গড়ে তুলেছে, যা মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের জন্য বৈষম্যমূলক ও ক্ষতিকর। ইউএসটিআর-এর নোটিশ অনুযায়ী, এই তদন্তের মাধ্যমে দেখা হবে—সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বাণিজ্যে কোনো অন্যায্য আচরণ করছে কিনা। যদি তদন্তে প্রমাণ পাওয়া যায় যে কোনো দেশের রপ্তানি নীতি মার্কিন বাণিজ্যে বাধা তৈরি করছে, তবে সেই দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
তদন্তের তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকা প্রসঙ্গে বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “বাংলাদেশ এমন কোনো পোশাক তৈরি করে না যা সরাসরি মার্কিন অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন আর নিজেরা সেই ধরনের পোশাক উৎপাদন করে না। এছাড়া আমাদের দেশে মেধাসত্ত্ব (IP) লঙ্ঘন বা নকল পণ্যের উৎপাদনও নগণ্য। আমরা আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মেনেই ব্যবসা করছি, তাই তদন্তে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ দেখি না।”
তবে তিনি একে এক ধরনের ‘কৌশলগত চাপ’ হিসেবে দেখছেন। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, গম ও এলএনজির মতো পণ্য বেশি করে আমদানির মাধ্যমে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার প্রস্তাব দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যেহেতু মার্কিন বাজার বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য, তাই বিষয়টি হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিআইডিএস-এর সাবেক মহাপরিচালক মুস্তাফা কে. মুজেরী বলেন, “আমরা যদি স্বচ্ছতার সাথে আমাদের তথ্য উপস্থাপন করতে পারি, তবে রপ্তানিতে বড় প্রভাব পড়বে না। তবে শ্রম অধিকার ও মজুরির মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে আমাদের আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।”
ইউএসটিআর-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত দেশগুলোকে আগামী ১৫ এপ্রিলের মধ্যে লিখিত জবাব দাখিল করতে হবে। এরপর ২৮ এপ্রিল ওয়াশিংটনে এ বিষয়ে একটি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা ইতিমধ্যে এই শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও যুক্তি তৈরিতে কাজ শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তদন্তের ফল যাই হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বা বর্তমান সুবিধা বজায় রাখতে হলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শ্রম বিধান (ILO) পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণের পথে হাঁটতে হবে।

















