শুল্কের ইট মেরে কানাডার পাটকেল কীভাবে সামলাবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে চলমান তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধ নজিরবিহীন কূটনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্ক নীতির জবাবে কানাডার অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড যে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাতে উত্তর আমেরিকার এই দুই প্রতিবেশীর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনের সাথে কানাডার বাণিজ্য আলোচনা কোনও সুরাহা ছাড়াই ভেস্তে যায়। এর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন কানাডা থেকে আমদানিকৃত ২০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যা গত শনিবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, সোমবার ট্রাম্প নতুন হুমকি দিয়ে বলেছেন, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে কানাডীয় গাড়ি, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ ও ইস্পাতের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হবে।
ট্রাম্পের দাবি, কানাডা বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করে মার্কিন অর্থ লুণ্ঠন করছে এবং আমেরিকার কৃষকদের ওপর অন্যায়ভাবে চড়া শুল্ক ধরে রেখেছে।
মার্কিন এই অর্থনৈতিক চাপের মুখে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নতি স্বীকার করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত কানাডাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সম্মান না দিয়ে তাদের অধীনস্থ কোনো অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মনে করবে, ততক্ষণ তারা আলোচনায় ফিরবেন না।
ট্রাম্পের শুল্কের জবাবে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কানাডাও মার্কিন পণ্য, বিশেষ করে ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, ইলেকট্রনিক্স ও কৃষি যন্ত্রাংশের ওপর সমপরিমাণ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
বাণিজ্যযুদ্ধে কানাডার পক্ষে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিয়েছেন অন্টারিও প্রদেশের সরকারপ্রধান ডগ ফোর্ড। তিনি ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি ‘আমার পশ্চাদ্দেশে চুমু দিন’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো দুটি বড় হুমকি দিয়েছেন।
কানাডার অন্টারিও প্রদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক, মিশিগানসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ঘরবাড়ি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ফোর্ড হুমকি দিয়েছেন, এই বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। ব্যাটারি ও আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অতিপ্রয়োজনীয় কানাডীয় খনিজ সম্পদ (যেমন—নিকেল, ইউরেনিয়াম, পটাশ) সরবরাহ আটকে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে তিনি উপহাস করে বলেন, আমেরিকার কোম্পানিগুলো যদি কানাডাকে ধ্বংস করতে চায়, তবে ট্রাম্প যেন তাদের জন্য ‘ব্যাটারির ব্যাকআপ’ প্রস্তুত রাখেন।
ডগ ফোর্ড মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বসেন। ট্রাম্পের ওভাল অফিসের দেওয়ালে ঝোলানো সাবেক জনপ্রিয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের ছবির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘রিগান যদি আজ ট্রাম্পের এই সংরক্ষণবাদী ও শুল্ক নীতি দেখতেন, তবে তিনি ট্রাম্পের ওপর নিশ্চিত বমি করতেন এবং নিজের কবরে শুয়ে ছটফট করতেন। ট্রাম্পের উচিত ওই ছবিটা দেওয়াল থেকে নামিয়ে ফেলা, কারণ রিগান আজ তার ওপর চরম অসন্তুষ্ট হতেন।’
ডগ ফোর্ডের এই বিস্ফোরক মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ফোর্ডের এই হুঁশিয়ারিকে ‘ফাঁপা হুমকি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প ডগ ফোর্ডকে একজন ‘ভাঁড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ট্রাম্প কড়া ভাষায় লেখেন, ‘কেউ যেন এই ভাঁড়গুলোকে লাইনে নিয়ে আসে, না হলে কানাডার জন্য এর পরিণতি আরও অনেক বেশি ভয়াবহ ও নির্মম হবে।’
দুই দেশের এই মারমুখী অবস্থানের কারণে উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন- এই সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যকার ঐতিহাসিক ইউএসএমসিএ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে। প্রায় ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের এই আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিটি যদি ভেঙে যায়, তবে কানাডা তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়বে।
অন্যদিকে রাতারাতি দুই দেশের সীমান্ত শুল্ক বাড়ার কারণে সাধারণ ভোক্তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যন্ত্রাংশের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যা উভয় দেশের বাজারেই বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।









