সাত বছর পর ফেনীর নুসরাত হত্যার বিচার: দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, ১০ জন খালাস

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় আদালতের দেওয়া ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় সংশোধন করেছেন হাইকোর্ট। সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে রাফিকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী সাবেক অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া চার আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর ১০ জনকে সম্পূর্ণ খালাস দিয়েছেন আদালত।
বিচারিক আদালতের দেওয়া পূর্বের ঢালাও রায়কে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে হাইকোর্ট আসামিদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সাজা পুনর্নির্ধারণ করেছেন। আদালত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলা এবং অন্যতম প্রধান সহযোগী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন।
অন্যদিকে, নুর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের, উম্মে সুলতানা পপি এবং জাভেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বাকি ১০ আসামিকে ঘটনার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে স্থানীয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন এবং কাউন্সিলর মাকসুদুল আলমও রয়েছেন।
রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টে সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল হাইকোর্টের একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। হাইকোর্ট বেঞ্চ নিম্ন আদালতের তৎকালীন বিচারক মামুনুর রশিদের দেওয়া ১৬ জনের ঢালাও মৃত্যুদণ্ডকে ‘বিচারিক বিবেচনাহীন দণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আদালত বলেন, ‘বিচারক তাঁর বিচারিক মনস্তত্ত্ব ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কার কতটুকু সম্পৃক্ততা ছিল তা আমলে না নিয়ে ১৬ জনকে একসাথে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আইনসম্মত হয়নি।’
এই পর্যবেক্ষণের আলোকেই হাইকোর্ট ওই বিচারককে অবিলম্বে ফৌজদারি মামলার বিচারিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন।
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নুসরাতকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। এই ঘটনায় নুসরাতের মা বাদী হয়ে মামলা করলে পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নুসরাত ও তার পরিবারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাতে নুসরাত নতি স্বীকার না করায়, ওই বছরের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে তাকে কৌশলে ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে তার শরীরের ৮০ শতাংশেরও বেশি পুড়ে যায়। নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান।
হাইকোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ফেনীর সোনাগাজীতে নুসরাতের বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নুসরাতের পরিবার রায়ের ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানালেও আইনি প্রক্রিয়ার এই ধাপটি সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে।










