বাংলাদেশ ইস্যুকে তুরুপের তাস করেই বিজেপির জয়!

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের নেপথ্যে ‘বাংলাদেশ ইস্যু’ তুরুপের তাস হিসেবে কাজ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, স্থানীয় স্তরের দুর্নীতি বা সরকারবিরোধী হাওয়ার চেয়েও ওপার বাংলার অস্থিতিশীলতা এপার বাংলার ভোটারদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলেছে, যা শেষ পর্যন্ত বিজেপিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিয়েছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩টির ঘোষিত ফলে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন। বিপরীতে বিদায়ী শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৮০টি আসন। এই ভূমিধস জয়ের পেছনে নাগরিকত্ব, জনমিতি এবং সভ্যতাগত নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো বড় ভূমিকা পালন করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি প্রেক্ষাপট বদলে দেয়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার খবর এবং উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, বিজেপি সেটিকে সুকৌশলে রাজনৈতিক বয়ানে রূপ দেয়।
বিজেপির এই সাফল্যের তিনটি প্রধান স্তম্ভ ছিল, নাগরিকত্ব ও সিএএ (CAA): নিপীড়িত হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দিয়ে বিজেপি মতুয়াদের মতো প্রভাবশালী ভোটব্যাংক নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে। অনুপ্রবেশ ও আত্মরক্ষা: তৃণমূলের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশকারীদের মদত দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিজেপি একে ‘সভ্যতাগত নিরাপত্তা’র লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা: ভোটারদের বোঝানো হয়েছে যে, শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি ছাড়া সীমান্তের ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাঙালি ব্যতিক্রমবাদ’—যেখানে দাবি করা হতো বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি উত্তর ভারতের হিন্দুত্ববাদকে প্রতিহত করবে—তা ২০২৬-এর রায়ে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। বিজেপি এখন বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়েই হিন্দুত্বের ভাষায় কথা বলতে শিখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো মানুষের ভীতি দূর করতে পারেনি, যেখানে বিজেপি নিজেকে ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
সুইডেনের লিনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ইতিহাসবিদের মতে, এবারের নির্বাচনে সীমানাকে নির্বাচনি অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। বিজেপি বুঝতে পেরেছে যে, ইতিহাস সবসময় অতীতে আটকে থাকে না; সঠিক কৌশলে একে বর্তমানের ব্যালট বক্সেও হাজির করা যায়। বাংলাদেশ ইস্যুকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া জাতীয়তাবাদী আবেগই শেষ পর্যন্ত বিজেপির জন্য ‘বাজিমাত’ নিশ্চিত করেছে।

















