ডিজিটাল নজরদারি, সাইবার হামলায় বিপন্ন সাংবাদিকতা

বর্তমান বিশ্বে সাংবাদিক, সংবাদ সংস্থা এবং তাদের তথ্যের উৎসের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পাইওয়্যার, অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং থেকে শুরু করে ডিডোস (DDoS) হামলার মতো বহুমুখী ডিজিটাল আক্রমণে বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে। সম্প্রতি ‘সেন্টার ফর নিউজ, টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন’ (CNTI)-এর এক গবেষণায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরণের সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্পাইওয়্যার ও ম্যালওয়্যার: ডিভাইসে অনধিকার প্রবেশ করে তথ্য চুরি করা। বিশেষ করে ‘জিরো-ক্লিক’ অ্যাটাক সাংবাদিকদের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। র্যানসমওয়্যার: ফাইল এনক্রিপ্ট করে মুক্তিপণ দাবি করা। ফিশিং ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং: প্রতারণার মাধ্যমে পাসওয়ার্ড বা সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া। ডিডোস (DDoS) হামলা: ট্রাফিক বাড়িয়ে সংবাদপত্রের ওয়েবসাইট অচল করে দেওয়া।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ৯০ শতাংশ দেশ সাইবার অপরাধ আইন প্রণয়ন করলেও, অনেক ক্ষেত্রে এই আইনগুলোই সাংবাদিকদের দমনে ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে এনক্রিপশন দুর্বল করা বা ভিপিএন (VPN) নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এছাড়া, বিচার ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সাংবাদিকদের হয়রানি করার প্রবণতা বা ‘লফেয়ার’ (Lawfare) বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
CNTI-এর ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা সাংবাদিকরা তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে পর্যাপ্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা সহযোগিতা পাচ্ছেন না। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ছোট নিউজ রুমগুলোতে প্রয়োজনীয় বাজেট ও প্রযুক্তির অভাবে সাংবাদিকরা সাইবার হাইজিন বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশনের মতো মৌলিক সুরক্ষা নিতে পারছেন না। এর ফলে তথ্যদাতারা বা ‘হুইসেলব্লোয়ার’রা পরিচয় ফাঁসের ভয়ে তথ্য দিতে কুণ্ঠাবোধ করছেন।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো একদিকে মানবাধিকার ও গোপনীয়তার কথা বললেও, অনেক সময় সরকারি চাপে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য হয়। ডাটা শেয়ারিংয়ের এই প্রক্রিয়া অনেক সময় ক্ষমতার অপব্যবহারকে সহজতর করে তোলে, যা প্রকারান্তরে মুক্ত সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল নিরাপত্তা কেবল কারিগরি বিষয় নয়, এটি সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত। এই সংকট মোকাবিলায় নিউজ রুমগুলোতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শক্তিশালী ডিজিটাল প্র্যাকটিস এবং নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ও নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। এছাড়া সাইবার অপরাধের একটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা নির্ধারণ করা জরুরি, যাতে আইনের অপপ্রয়োগ রোধ করা যায়।
গবেষণার সারসংক্ষেপ বলছে, সাংবাদিকরা যদি ডিজিটালভাবে নিরাপদ না থাকেন, তবে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে গণতন্ত্রের ওপর।
মুহূর্ত/এমএইচ

















