২৮ বছরে শোধ করতে হবে রাশিয়ার ঋণ: রূপপুরের আর্থিক সমীকরণ

বাংলাদেশের ইতিহাসে একক বৃহত্তম ও ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থায়ন আসছে রাশিয়ার কাছ থেকে। তবে এই বিপুল ঋণের বোঝা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া। এই ঋণ পরিশোধের জন্য বাংলাদেশকে ২৮ বছর সময় দেওয়া হয়েছে। যদিও মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী কিস্তি সাধারণ বিষয়, তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা এই ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকল্পের শুরুতে হিসাব করা হয়েছিল যে, রূপপুর থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হবে প্রায় ৬ টাকা। কিন্তু দীর্ঘ নির্মাণ প্রক্রিয়া, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় বৃদ্ধির ফলে এখন সেই খরচ দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ পড়বে প্রায় ১২ টাকা। এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাতের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করবে, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
রাশিয়া কেবল অর্থায়নই নয়, বরং এই প্রকল্পে সম্পূর্ণ আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। প্রথম তিন বছর জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্বও রাশিয়ার। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী:
ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় জ্বালানি রাশিয়া নিজেদের দেশে ফেরত নিয়ে যাবে, যা বাংলাদেশের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ সাশ্রয় করবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রাথমিক আয়ু ৬০ বছর হলেও, এটি ৯০ বছর পর্যন্ত সেবা দিতে পারবে। অর্থাৎ দীর্ঘ মেয়াদে এটি একটি স্থায়ী সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে।
প্রাথমিক তিন বছর পার হওয়ার পর বাংলাদেশকে নিজস্ব উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। প্রতি দুই বছর অন্তর জ্বালানি পরিবর্তন বা রিফুয়েলিংয়ের প্রয়োজন পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরেনিয়ামের দামের স্থিতিশীলতাও রূপপুরের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুরুতে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি মনে হলেও কয়লা বা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রূপপুরের বিকল্প নেই। তবে সময়মতো ঋণ পরিশোধ এবং বিদ্যুৎ বিতরণের দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের মূল লক্ষ্য।

















