নাগরিক গোয়েন্দা শামীউল আলীম শাওন

মো. মানিক হোসেন: রাজশাহীর ঘোড়ামারা এলাকার ধুলোমাখা দুপুর। প্রধান ডাকঘরের মেইল শাখায় চিঠির স্তূপ আর সরকারি খাতার ভিড়ে মাথা গুঁজে কাজ করছেন এক সাধারণ যুবক। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে, তাঁর পৃথিবীটা বোধহয় এই চার দেয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু দিনের আলোয় যিনি দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা একজন সাধারণ ‘পোস্টাল অপারেটর’, সূর্য ডুবলেই তিনি হয়ে ওঠেন বরেন্দ্র জনপদের এক অতন্দ্র প্রহরী। কাঁধে রাইফেল নেই, পরনে নেই ইউনিফর্ম; কিন্তু তাঁর পকেটে থাকা একটি কলমই কাঁপন ধরিয়ে দেয় নীতিনির্ধারকদের অন্দরমহলে।
গল্পটা শামীউল আলীম শাওনের। এক বুক ভাঙা স্বপ্ন থেকে নতুন এক মহীরুহ জন্ম নেওয়ার গল্প।
ছেলেবেলায় শাওনের দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গর্বিত অফিসার হওয়ার। ইচ্ছা ছিল ‘মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স’ কিংবা ‘প্যারা কমান্ডো’র সদস্য হয়ে মাতৃভূমির সুরক্ষা নিশ্চিত করা। পরিস্থিতির ফেরে সেই জলপাই রঙের ইউনিফর্ম গায়ে জড়ানো হয়নি ঠিকই, কিন্তু তাঁর ভেতরের দেশপ্রেমিক আর গোয়েন্দা সত্তাটি একটুও ম্লান হয়নি। আজ তিনি এক ‘নাগরিক গোয়েন্দা’। ডাক বিভাগের পরিদর্শক বাবা মো. শাহীনূরুল ইসলামের মতোই তিনি জনগণকে সেবা দিচ্ছেন, তবে সেই সেবার পরিধি তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন সমাজের বিশাল ক্যানভাসে।
২০১০ সালের মে মাসে মা শাপলা শাহীনের প্রয়াণ শাওনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মায়ের চলে যাওয়ার সেই গভীর বিষাদকে তিনি রূপান্তরিত করেছেন আর্তমানবতার সেবার শক্তিতে। ২০০৮ সালে নবম শ্রেণিতে থাকাকালীন ‘গোল্ডেন বয়েজ কমিটি’র মাধ্যমে তাঁর যে সাংগঠনিক পথচলা শুরু হয়েছিল, তা পূর্ণতা পায় ২০১৫ সালে। বন্ধু শাহরুখ শুভ আর মাশরুহকে সাথে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ – ইয়্যাস’। গত এক দশকে এই সংগঠনটি রাজশাহীর তরুণদের ভরসার এক অনন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের আন্দোলনের পাশাপাশি শাওন তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন কলমকে। ‘দৈনিক সোনার দেশ’, ‘সিল্কসিটি নিউজ’ কিংবা ‘কালের কণ্ঠ’ অনলাইনের মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করলেও তাঁর লেখা ইত্তেফাক, সংবাদ, ভোরের কাগজ ও ভিউজ বাংলাদেশ-এর মতো জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় পাতায় নিয়মিত স্থান পায়।
তাঁর লেখনী সমাজের রূঢ় বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ‘শিক্ষা: ক্লাসরুম মৃত, বাণিজ্য জ্যান্ত’ কিংবা রাজশাহীর তালাবদ্ধ বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল নিয়ে তাঁর লেখা ‘৪৪টি ক্ষুদ্র কফিন ও একটি তালাবদ্ধ ফাইল: কাঠামোগত হত্যার দায় কার?’ প্রবন্ধগুলো সচেতন মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তিনি রাজশাহীর পুকুর ভরাট ও গাছকাটা বন্ধ করা কিংবা খানাখন্দে ভরা সড়ক সংস্কারের মতো অসংখ্য আন্দোলনের সামনের সারির কারিগর।
পরিবেশ, প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় নিরলস কাজের স্বীকৃতি হিসেবে শাওন ও তাঁর সংগঠন ‘ইয়্যাস’ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা ‘বেস্ট ইয়ুথ অর্গানাইজেশন অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে। ২০১৯ সালে তিনি পান ‘সেরা ক্যাম্পেইনার’ এবং ২০২০ সালে ‘শ্রেষ্ঠ যুব’ সম্মাননা। ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী মেঘলা খাতুন এবং দেড় বছর বয়সী ছেলে নূর মোহাম্মদ মুত্তাজিমকে নিয়েই তাঁর ভালোবাসার পৃথিবী।
শাওনের পুরো জীবনদর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটি অব্যর্থ সত্য— “নেতৃত্ব মানে পদ নয়, নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব”। তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের প্রতিটি নাগরিক যদি কেবল নিজের অধিকারটুকু বুঝে নেয় এবং নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করে, তবে কোনো অশুভ শক্তিই সমাজকে পিছিয়ে রাখতে পারবে না। শামীউল আলীম শাওন তাই কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি বরেন্দ্রর মাটির সেই নীরব প্রতিধ্বনি, যিনি প্রতিটা শব্দের মাধ্যমে মানুষের দীর্ঘশ্বাসকে আশায় রূপান্তর করার এক নিঃশব্দ মিশন নিয়ে প্রতিদিন পথে নামেন।

















