রূপপুরে চুল্লিতে ইউরেনিয়াম, পারমাণবিক বিদ্যুতের পথে বাংলাদেশ

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হয়েছে। কড়া নিরাপত্তায় মঙ্গলবার বিকেলে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এর মধ্যদিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হলো বাংলাদেশ।
জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেন, ‘আজ ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটির কাজ করা হয়েছে। আজ জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিহাসের অংশ হলো। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ শুধু পাবনা নয়, দেশের অর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।’ আলোচনা শেষে অতিথিরা স্বয়ংক্রিয় সুইচ টিপে জ্বালানি লোডিং উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রিঅ্যাক্টর। এখানে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হবে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে।
রিঅ্যাক্টরের চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি স্থাপন করা হলে নিউক্লিয়ার বিভাজনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে টারবাইন ঘোরাবে। আর টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর থেকে উৎপাদন হবে বিদ্যুৎ। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর জানান, জ্বালানি লোড করার পর রিয়্যাক্টরের ভেতরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই চেইন রিঅ্যাকশন বা ‘ফিশন বিক্রিয়া’ শুরু হয়। একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। শুরুতে রিঅ্যাক্টরকে তার পূর্ণ ক্ষমতার মাত্র এক থেকে তিন শতাংশ স্তরে রেখে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের প্যারামিটারগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্ট আপ। ডিজাইন অনুযায়ী, নিউক্লিয়ার ফিশান রিয়্যাকশন ঘটানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে প্রায় ৩৪ দিন সময় প্রয়োজন হবে। পরীক্ষা শেষে রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে তিন, পাঁচ, ১০, ২০ ও ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৪০ দিন।
রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তা বিষয়ক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সবমিলে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। চলতি বছরের শেষ বা আগামী বছরের শুরুতে ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গণমাধ্যমকে বলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হবে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানি স্থাপনের কাজ শুরু হবে। ওই বছরে সেপ্টেম্বরে রূপপুরের দু’টি ইউনিট থেকে মোট ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হয়েছে গত বছরের মে মাসে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সঞ্চালন লাইনের কাজ চলছে পুরোদমে। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হতে পারে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সঙ্গে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি সই হয় ২০১১ সালে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা রোসাটমের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন চুক্তি হয়। এই চুক্তির আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবল প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দেশের একক বৃহত্তম প্রকল্প হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া, যা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। শুরুতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছয় টাকা ধরা হলেও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে তা বেড়ে প্রায় ১২ টাকায় দাঁড়াতে পারে।
প্রকল্পটিতে বাংলাদেশি ও রাশিয়ান প্রকৌশলী, বিশেষজ্ঞ এবং শ্রমিক মিলিয়ে বড় পরিসরের জনবল কাজ করছে। এখানে সরাসরি প্রায় আড়াই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। নির্মাণকালীন প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক প্রকল্প এলাকায় কাজ করছে, যেখানে দেশি ও বিদেশি জনবল রয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় রূপপুরে তৃতীয় প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়। পুরো প্রকল্প আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্ধারিত কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে ‘জিরো এরর’ নীতিতে পরিচালনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সামান্য বিচ্যুতিও প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত করতে পারে।

















