মফস্বল সাংবাদিকতার জনক কাঙ্গাল হরিনাথের প্রয়াণ দিবস আজ

আজ ১৪ মার্চ। বাংলা সাংবাদিকতা ও লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের ১৩০তম প্রয়াণ দিবস। ১৮৯৬ সালের এই দিনে (বাংলা ৩০ চৈত্র, ১৩০২ বঙ্গাব্দ) কুষ্টিয়ার কুমারখালীর এই কালজয়ী ব্যক্তিত্ব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় শোষিত কৃষকের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা এই মানুষটি আজও এদেশের বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতার প্রধানতম আদর্শ।
১৮৩৩ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হরিনাথ মজুমদার। বাল্যকালেই মা-বাবাকে হারিয়ে চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে বড় হন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদূর না এগোলেও নিজের প্রচেষ্টায় তিনি জ্ঞানার্জন করেন। ১৮৬৩ সালে তিনি প্রকাশ করেন ঐতিহাসিক পত্রিকা ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’।
তৎকালীন সময়ে কলকাতার বড় বড় পত্রিকাগুলো যখন উচ্চবিত্ত ও রাজন্যবর্গের সংবাদে ব্যস্ত ছিল, তখন হরিনাথ বেছে নিয়েছিলেন অবহেলিত পল্লী জনপদকে। তিনি প্রথম দেখিয়েছিলেন যে, প্রান্তিক মানুষের দুঃখ-দুর্দশাও সংবাদের প্রধান বিষয় হতে পারে। এ কারণেই তাঁকে ‘মফস্বল সাংবাদিকতার জনক’ বলা হয়।
কাঙ্গাল হরিনাথের সাংবাদিকতা ছিল শোষকের জন্য আতঙ্ক। নীলকর সাহেবদের অত্যাচার এবং স্থানীয় জমিদারদের প্রজাপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল আপসহীন। তাঁর লেখনীর কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে কুষ্টিয়ার প্রভাবশালী জমিদাররা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল। কথিত আছে, একবার জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী তাঁকে আক্রমণ করতে এলে স্বয়ং লালন শাহ তাঁর শিষ্যদের নিয়ে হরিনাথকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন। লালন সাঁইয়ের সাথে তাঁর এই আত্মিক ও আদর্শিক সম্পর্ক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
সাংবাদিকতার প্রসারে তিনি নিজের বাড়িতেই স্থাপন করেছিলেন ‘এম.এন প্রেস’ (মথুরানাথ প্রেস)। ১৮৭৩ সালে স্থাপিত এই হাতে চালানো কাঠের ছাপাখানাটি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অন্যতম আদি প্রেস। এই প্রেস থেকে বের হওয়া প্রতিটি শব্দ ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিত। আজও কুমারখালীতে এই ঐতিহাসিক ছাপাখানাটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হরিনাথ মজুমদার কেবল সাংবাদিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মরমী সংগীতসাধক। তিনি ‘কাঙ্গাল ফিকির চাঁদ বাউল’ ছদ্মনামে গান লিখতেন এবং একটি বড় বাউল দল গঠন করেছিলেন। তাঁর রচিত— ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো, পার করো আমারে’ গানটি আজও বাঙালির আধ্যাত্মিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর ত্যাগের কারণে সাধারণ মানুষই তাঁকে ‘কাঙ্গাল’ উপাধিতে ভূষিত করে, যা পরবর্তীতে তাঁর নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়।
আজকের কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমের যুগে কাঙ্গাল হরিনাথ আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, সাংবাদিকতা কোনো ব্যবসা নয়, বরং এটি একটি মহান ব্রত। কোনো ভয়ভীতি বা প্রলোভনের কাছে মাথা নত না করে সত্য প্রকাশ করাই যে একজন প্রকৃত সাংবাদিকের কাজ, তা তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন।
প্রয়াণ দিবসের এই লগ্নে বাংলার এই মহৎ প্রাণ কলমযোদ্ধার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

















