এআই-এর যুগে সত্য সংবাদ চিনে নেওয়া এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ

বর্তমান বিশ্ব এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আমাদের জীবনকে সহজ করছে, অন্যদিকে এটি সংবাদ ও তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের কাজটিকে করে তুলেছে আরও জটিল। জেনারেটিভ এআই-এর মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে তৈরি করা যাচ্ছে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য সব ছবি, ভিডিও এবং খবর—যা অনেক সময় খোদ সংবাদকর্মীদেরও বিভ্রান্তিতে ফেলে দিচ্ছে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) বা জেমিনি (Gemini)-র মতো এআই টুলগুলো অনেক সময় অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ভুল তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’ তৈরি করে। যেহেতু এসব টুল মানুষের লেখার ধরণ হুবহু নকল করতে পারে, তাই পাঠকদের পক্ষে এআই-জেনারেটেড খবর এবং মানুষের লেখা প্রকৃত সংবাদের মধ্যে পার্থক্য করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে যখন এআই ব্যবহার করে ভুয়া খবর ছড়ানো হয়, তখন তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
রয়টার্স ইনস্টিটিউট ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৫৩টি দেশের সংবাদমাধ্যম নেতারা এআই ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। তবে পাঠকদের বড় একটি অংশ মনে করে, এআই ব্যবহারের ফলে সংবাদের নিরপেক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতা কমছে। বিশেষ করে ইমেজ জেনারেশন অ্যাপগুলো দিয়ে তৈরি করা ‘ডিপফেক’ ছবি বা ভিডিও এখন রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ও ব্যক্তিগত মানহানিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এআই-এর বড় একটি সমস্যা হলো এটি ইন্টারনেটে থাকা হাজার হাজার বছরের মানুষের তৈরি তথ্য ও সংবাদ থেকে ‘শিখে’ নতুন তথ্য দেয়। এতে করে মূল সংবাদদাতার কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেক সময় এআই কোনো তথ্যের উৎস বা রেফারেন্স দিতেও ব্যর্থ হয়, যা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই-এর যুগে সত্য সংবাদ চিনে নিতে পাঠকদের আরও সচেতন হতে হবে। কোনো খবর বিশ্বাস করার আগে কিছু বিষয় যাচাই করা জরুরি:
১. সংবাদটি কোন উৎস বা ওয়েবসাইট থেকে এসেছে তা দেখা।
২. মূলধারার নামি সংবাদমাধ্যমগুলোতে সেই খবরটি আছে কি না তা মিলিয়ে নেওয়া।
৩. ছবির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক আলো বা অবাস্তব কোনো সংকেত আছে কি না তা খেয়াল করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের অনেক দেশ এখন এআই নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়ন করছে। তবে শুধু আইন দিয়ে এটি ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, এআই দিয়ে তৈরি কন্টেন্ট শনাক্ত করার জন্য ‘কাউন্টার-এআই’ বা পাল্টা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে।
পরিশেষে, এআই প্রযুক্তিকে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু এর অপব্যবহার রুখতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সাংবাদিকতায় উদ্ভাবন জরুরি, তবে জনমানুষের আস্থা ধরে রাখতে তথ্যের সত্যতা যাচাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’-এর কোনো বিকল্প নেই।
মুহূর্ত/এমএইচ

















