মমতার নিজের ‘ভোটব্যাঙ্ক’ বাঁচানোর লড়াই!

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলে ততই বাড়ছে স্নায়ুর চাপ। আপাতদৃষ্টিতে বিজেপির ‘আগ্রাসী’ মেজাজকে বড় প্রতিপক্ষ মনে করা হলেও, তৃণমূলের রণকৌশলী নেতারা একান্ত আলোচনায় মানছেন যে, এবারের ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের রাজনৈতিক ‘পুঁজি’ বা দীর্ঘ দেড় দশকের নিশ্চিত সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক অটুট রাখা। গত ১৫ বছরে এই ভোটব্যাঙ্ক তৃণমূলের জয়ের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করলেও, এবারই প্রথম সেই দুর্গে ফাটল ধরার মতো একাধিক শক্তিশালী উপকরণ ও রাজনৈতিক সমীকরণ দানা বেঁধেছে।
তৃণমূল শিবিরের প্রধান চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন নওশাদ সিদ্দিকি। ২০২১ সালে তাঁর দল আইএসএফ নবাগত হলেও গত পাঁচ বছরে নওশাদ নিজেকে সংখ্যালঘু, দলিত ও আদিবাসীদের অধিকারের লড়াইয়ে একজন পোড়খাওয়া নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রচার এবং বামেদের সঙ্গে সম্ভাব্য আসন সমঝোতা তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে ভাগ বসাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি মুর্শিদাবাদে হুমায়ুন কবীরের ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’ এবং আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল ‘মিম’-এর জোটবদ্ধ সক্রিয়তা উত্তর দিনাজপুর, মালদহ ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোতে শাসকদলের অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে বিহার সীমান্ত লাগোয়া এলাকাগুলোতে মিমের সাম্প্রতিক উত্থান তৃণমূলের আসন সংখ্যায় বড়সড় থাবা বসাতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৪৬টি আসনে সংখ্যালঘু ভোট ২৫ শতাংশের বেশি, যার মধ্যে ৭৪টি আসনে এই হার ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ২০২১ সালে এই ১৪৬টি আসনের মধ্যে ১৩১টিতেই তৃণমূল বিপুল ব্যবধানে জিতেছিল। কিন্তু এবারের সমীকরণ ভিন্ন। মালদহ ও মুর্শিদাবাদে গনিখান চৌধুরী পরিবারের সদস্যদের কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন এবং বাম-কংগ্রেসের অটুট গণভিত্তি শাসকদলের জয়ের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূলের অন্দরের এই চোরাস্রোত ও সংখ্যালঘুদের ক্ষোভের কথা ধরা পড়েছে মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর বয়ানেও। তিনি স্বীকার করেছেন যে বিজেপিকে রোখার স্বার্থে বর্তমানে ‘দু’পা এগিয়েও পাঁচ পা পিছিয়ে’ আসতে হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে পরিস্থিতির জটিলতাকেই স্পষ্ট করে।
একদিকে যখন বিজেপি হিন্দু ভোটকে মেরুকরণের মাধ্যমে এককাট্টা করার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে, তখন তৃণমূলের সামনে নিজেদের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া ভোটব্যাঙ্ক রক্ষা করাই হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্তিত্বের লড়াই। মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো নির্ণায়ক জেলাগুলোতে সংখ্যালঘু ভোটের এই বহুমুখী বিভাজন শেষ পর্যন্ত ২০২৬-এর নির্বাচনী ফলাফলকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।

















