৪০ শতাংশের বেশি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, কঠোর নিরাপত্তার আশ্বাস ইসি’র

নির্বাচন কমিশনে পুলিশের পাঠানো তালিকায় বলা হয়েছে- ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৭৫ শতাংশের বেশি ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। আর দেশের সব ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্র ৪০ শতাংশের ওপরে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে। বিশেষ করে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনায় অনেককে শঙ্কিত করেছে।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে না পারায় বিষয়টি নিয়েও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আগে থেকেই সতর্ক করেছেন।
তবে এসব বিষয় আমলে নিয়ে এবারের নির্বাচনে ‘নজিরবিহীন’ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রেকর্ড সংখ্যক সদস্যকে আমরা মাঠে রেখেছি। সেইসঙ্গে, কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং পুলিশের কাছে বডি ওর্ন ক্যামেরা, যা আগে কোনো নির্বাচনে দেখা যায়নি। কাজেই ভোটারদের ভয়ের কোনো কারণ নেই।’
নির্বাচন কমিশনের এসব পদক্ষেপে স্বস্তি প্রকাশ করলেও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভোটের দিন ভিন্ন রকম চ্যালেঞ্জ সামনে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম জানান, ‘নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নেওয়া ব্যবস্থাগুলো স্বস্তিদায়ক। কিন্তু শঙ্কার আরেকটি বড় জায়গা রয়ে গেছে, সেটি হলো- গুজব ও অপতথ্য।’
‘এটা মনিটরিং করে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভোটের দিন পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠতে পারে এবং সেটার ফলে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে পারে,’ বলেন আব্দুল আলীম।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ‘শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক’ করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। বুধবার ঢাকায় বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য সব প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হয়েছে… আমি একটি শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমিশনের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে চাই।’
বুধবার সকাল থেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে শুরু করে ব্যালট পেপার, বক্স, সিল, কালিসহ অন্যান্য নির্বাচনী সরঞ্জাম। রাতের মধ্যেই ৪২ হাজারেরও বেশি ভোট কেন্দ্রে পৌঁছে যাবে এগুলো।
একজন প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় শেরপুর-৩ আসনে বৃহস্পতিবার ভোট হবেনা। ফলে বাকি ২৯৯টি আসনে বৃহস্পতিবার সকালে একযোগে শুরু হবে ভোটগ্রহণ। এদিন সকাল সাড়ে সাতটায় শুরু হয়ে একটানা ভোটগ্রহণ চলবে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত।
এবারের নির্বাচনে ভোটাররা সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য সাদা ব্যালটে ভোট দেবেন। আর গোলাপি রঙের ব্যালট ব্যবহৃত হবে গণভোটের জন্য। এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বিশ্বের ৪৫টি দেশ ও সংস্থা থেকে প্রায় ৩৩০ জন প্রতিনিধি থাকছেন বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর বাইরে, দেশের ভেতরের ৮১টি নিবন্ধিত সংস্থার ৪৫ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক মাঠে থাকবেন।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র যতগুলো
সাধারণত নির্বাচন কমিশন ভোটকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করার পরই পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কয়েকটি মানদণ্ডকে সামনে রেখে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত করে। এক্ষেত্রে, অতীতে যেসব কেন্দ্রে সহিংসতা, ভাঙচুর বা ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় রাখা হয়।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা তৈরি করা হয়। অর্থাৎ পার্বত্য অঞ্চল, দুর্গম চরাঞ্চল বা সীমান্তবর্তী এলাকার কেন্দ্রগুলোকেও রাখা হয় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকায়। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বাড়ি কিংবা প্রভাবশালী কোনো রাজনৈতিক নেতার বাড়ির পাশে যদি কোনো ভোটকেন্দ্র থাকে, সেটিও রাখা হয় এই তালিকায়।
ভঙ্গুর যাতায়ত ব্যবস্থা কিংবা যে জায়গায় কোনো ধরনের সহিংসতা ঘটলে সহজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছাতে পারে না, সেই কেন্দ্রগুলোকেও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্রের তালিকায় রাখা হয়। এছাড়া যেসব ভোটকেন্দ্রে অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীর নেই সেই সব কেন্দ্রকেও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১২ই ফ্রেব্রুয়ারির নির্বাচনে ৪২ হাজারেরও অধিক ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রকে নানান কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্য জেলার তুলনায় ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় থাকা ১৫টি আসনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যাও বেশি বলে জানা যাচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দুই হাজার ১৩১টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে এক হাজার ৬১৪টিই ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলোর নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে নির্বাচন কমিশন।
কেন্দ্রের নিরাপত্তায় যেসব ব্যবস্থা থাকবে:
এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় নয় লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মাঠে রয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে সেনাসহ এক লাখেরও বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য থাকবেন। ভোটকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেছেন, এবারের নির্বাচনে সারাদেশে এক লাখ ৫৭ হাজার পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে। তাদের সাথে সাপোর্টিং হিসেবে আরো ৩০ হাজার পুলিশ বাহিনীর সদস্য। সব মিলিয়ে ভোটে পুলিশ বাহিনীর ৮৮ শতাংশ সদস্যই নির্বাচনে মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন।
যে সব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন থাকবে বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে সাধারণ ভোটকেন্দ্রতে অস্ত্রসহ দুইজন পুলিশ, আনসার ভিডিপি, গ্রাম পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন।
মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরের যেসব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেব তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, সেখানে তিন থেকে চারজন অস্ত্রসহ পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন।
ছবির ক্যাপশান,রাজধানী ঢাকায় ৭৫ শতাংশের বেশি ভোট কেন্দ্র ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে চিহ্নিত করেছে আইনশৃ্ঙখলা বাহিনী
তবে আনসার, ভিডিপি ও গ্রাম পুলিশের সংখ্যা একই পরিমাণে থাকবে।
অন্যদিকে, মেট্রোপলিটন এলাকার মধ্যে যে সব ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে সেখানে অস্ত্রসহ পুলিশ থাকবে চারজন করে।
ঢাকাসহ সারা দেশের সারাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এর বাইরে, এসব কেন্দ্রে পুলিশের এযসব সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের সঙ্গে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা।
ভোট কেন্দ্রগুলোতে পুলিশের সঙ্গে ২৫ হাজারের বেশি বডিওর্ন ক্যামেরা থাকবে। এরমধ্যে ১৫ হাজার বডিওর্ন ক্যামেরা ‘অনলাইনে’ থাকবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।
“সেগুলো আমাদের সার্ভার স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় ভোটকেন্দ্রের লাইভ ভিডিও দেখা যাবে। ফলে সার্বক্ষণিকভাবে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন পুলিশের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান, যিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্রের দায়িত্বে রয়েছেন।
পুলিশের বাকি প্রায় ১০ হাজার বডিওর্ন ক্যামেরা থাকবে ‘অফলাইন’। এসব ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও সেটির মেমোরিতে রেকর্ড থাকবে, যা প্রয়োজনে পরে ব্যবহার করা যাবে।
এগুলোর বাইরে, নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কয়েকশ’ ড্রোন এবং ডগ স্কোয়াড টিম মাঠে থাকবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কিন্তু সামাজিক মাধ্যমসহ সাইবার পরিসরে ‘গুজব বা অপতথ্য’ ছড়ানো নিয়ে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার যে আশঙ্কার কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেটির বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
“গুজব ও অপতথ্য চেক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমাদের আলাদা ম্যাকানিজম রয়েছে। এছাড়া পুলিশের সাইবার সেলসহ আরও অনেক সরকারি সংস্থা বিষয়টির দিকে নজর রাখছে। কাজেই সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না বলে আমরা আশা করছি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।

















