‘বাংলাদেশের বন্ধু’ ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং’র প্রয়াণ দিবস আজ

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ও কিংবদন্তি ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং’র মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০২১ সালের ১৬ জুলাই ৭৬ বছর বয়সে রোমানিয়ার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। সেখানকার একটি হাসপাতালে হার্নিয়া অপারেশনের পর তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন।
বাংলাদেশে টেলিভিশন সাংবাদিকতার পথিকৃত সাইমন ড্রিং জীবনের শেষ দিনগুলোতে রোমানিয়াতে বসবাস করছিলেন এবং সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সাইমন ড্রিং ১৯৪৫ সালের ১১ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের নরফোক-এ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত যুদ্ধ সংবাদদাতা, টেলিভিশন প্রযোজক ও উপস্থাপক।
মুক্তিযুদ্ধে অবদান ও সম্মাননা
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর গণহত্যার খবর তিনি ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় প্রথম বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে, তখন তারা সব বিদেশি সাংবাদিককে হোটেলে অবরুদ্ধ করে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সাইমন ড্রিং কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে হোটেলের লবি, কিচেন এবং ছাদে প্রায় ৩২ ঘণ্টা লুকিয়ে থাকেন।
প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্ব কাঁপানো প্রতিবেদন
২৭শে মার্চ কারফিউ কিছুটা শিথিল হলে তিনি একটি বেকারির ভ্যানে চড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল), রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স এবং পুরান ঢাকা ঘুরে গণহত্যার প্রমাণ ও নোট সংগ্রহ করেন। এরপর ব্যাংকক হয়ে লন্ডনে পৌঁছে ৩০শে মার্চ দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় “Tanks Crush Revolt in Pakistan” শিরোনামে প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০১২ সালে “মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা” দেয়।
সর্বকনিষ্ঠ যুদ্ধ সংবাদদাতা
মাত্র ১৯ বছর বয়সে রয়টার্সের হয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধ কাভার করার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সবচেয়ে কম বয়সী যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবে পরিচিতি পান। দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি রয়টার্স, ডেইলি টেলিগ্রাফ এবং বিবিসি-র হয়ে বিশ্বজুড়ে ২২টিরও বেশি যুদ্ধ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব কাভার করেন। এর মধ্যে নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ, সাইপ্রাসে তুর্কি আগ্রাসন এবং ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামিক বিপ্লব উল্লেখযোগ্য। তবে উগান্ডার স্বৈরশাসক ইদি আমিনের শাসনামলে তিনি বন্দি হন এবং তাঁকে প্রায় মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও অর্জন
সাহসী সাংবাদিকতা এবং তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য তিনি বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার পান। এরমধ্যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যার প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য ইউকে রিপোর্টার অব দ্য ইয়ার স্বীকৃতি পান। ‘ইন্টারন্যাশনাল ভ্যালিয়েন্ট ফর ট্রুথ’ পুরস্কার পান বিবিসি টেলিভিশনের হয়ে ইরিত্রিয়ার গরিলা বাহিনীর সাথে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিবেদন করার জন্য। কুর্দিদের ওপর তুরস্কের যুদ্ধ নিয়ে বিবিসি রেডিওতে প্রামাণ্যচিত্র তৈরির জন্য অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়াও নিউইয়র্ক ফেস্টিভ্যাল গ্র্যান্ড প্রাইজ পেয়েছিলেন হাইতিতে মার্কিন আগ্রাসন নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরির জন্য।
বাংলাদেশে আধুনিক টেলিভিশন সাংবাদিকতার প্রবাদপুরুষ
১৯৯৭ সালে তিনি বিবিসি-র চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশে এসে প্রথম বেসরকারি টেরেস্ট্রিয়াল চ্যানেল একুশে টেলিভিশন (ETV)-এর লাইসেন্স ও সম্প্রচার অবকাঠামো তৈরিতে মূল ভূমিকা নেন। তাঁকে সাংবাদিক “বাংলাদেশে টেলিভিশন সাংবাদিকতার জনক” বলা হয়। ২০০২ সালে রাজনৈতিক কারণে তৎকালীন সরকার একুশে টিভি বন্ধ করে দিলে তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল।
এরপর যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বাবুলের বিশেষ অনুরোধে ২০১৩ সালের শেষভাগে যমুনা টেলিভিশনে যুক্ত হন। তিনি এই ২৪ ঘণ্টার সংবাদভিত্তিক চ্যানেলে ‘প্রধান সম্প্রচার উপদেষ্টা’ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ২০১০ সালে আইনি জটিলতায় যমুনা টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, ২০১৩ সালের জুলাই মাসে চ্যানেলটি পুনরায় চালুর লাইসেন্স পায়।
একটি বিশ্বমানের ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল হিসেবে এটিকে গড়ে তোলার জন্য যমুনা গ্রুপ ড্রিংকে আমন্ত্রণ জানায়। তিনি এই দায়িত্ব নিয়ে ২০১৩ সালে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় পর পুনরায় বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসেন।
আন্তর্জাতিক মানের একটি নিউজ স্টেশন চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ডিজাইন ও সম্প্রচার প্রযুক্তির আধুনিকায়নে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় দীর্ঘ এক মাস পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শেষে ২০১৪ সালের ৫ এপ্রিল যমুনা টেলিভিশন পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক সম্প্রচারে যায়। যমুনা টেলিভিশনই ছিল বাংলাদেশে সাইমন ড্রিংয়ের কাজ করা সর্বশেষ গণমাধ্যম। তিনি ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ছাড়েন।















