ওমানে নিহত চার ভাইয়ের জানাজা পড়ালেন একমাত্র ভাই

কোরবানির ঈদ আর দুই ভাইয়ের বিয়ে—সব মিলিয়ে আনন্দ-উৎসবের এক মহাপ্রস্তুতি চলছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এক প্রবাসীর পরিবারে। ওমান থেকে চার ভাইয়ের একসঙ্গে দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। কিন্তু সেই উৎসবের আনন্দ নিমেষেই রূপ নিল বিষাদে। উৎসবের বদলে বাড়িতে ফিরল চার ভাইয়ের নিথর দেহ। ওমানে গাড়ির এসির বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে মৃত্যুর পর আজ বুধবার (২০ মে) ভোরে তাঁদের কফিনবন্দি মরদেহ পৌঁছায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বন্দাররাজার পাড়ায়।
নিহত চার ভাই হলেন—রাশেদুল ইসলাম, সাহেদুল ইসলাম, মো. সিরাজুল ইসলাম ও মো. শহিদুল ইসলাম। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে বেঁচে থাকা একমাত্র ভাই মাওলানা মো. এনামুল ইসলামের ইমামতিতে জানাজা শেষে তাঁদের পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ওমান থেকে গত মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে চার প্রবাসীর মরদেহ দেশে পৌঁছায়। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাত ৯টার দিকে রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী কফিনবন্দি মরদেহগুলো গ্রহণ করেন। এর আগে গত ১২ মে রাতে ওমানে চার ভাই মিলে বিয়ের কেনাকাটা করতে গাড়িতে করে বের হয়েছিলেন। পরদিন ১৩ মে সকালে ওমানের মুলাদাহ এলাকায় একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতর থেকে তাঁদের অচেতন দেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ।
ওমানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, গাড়ির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হয়েই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে এক ভাই তাঁদের চাচাতো ভাই পারভেজের কাছে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। অত্যন্ত আকুতিভরা সেই মেসেজে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা খুবই অসুস্থ। গাড়ি থেকে বের হতে পারছি না।’ এর ১০ মিনিট পর পারভেজ ফিরতি কল করলেও ওপাশ থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি।
আজ বুধবার বেলা ১১টায় নিজ গ্রাম রাঙ্গুনিয়ার লালানগর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে চার ভাইয়ের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মর্মান্তিক এই জানাজায় অংশ নেন জেলা প্রশাসন, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ হাজার হাজার শোকাকুল মানুষ। জানাজা শেষে বন্দারাজারপাড়া জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে পাশাপাশি চার ভাইকে দাফন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, চার ছেলের একসঙ্গে মৃত্যুর এই ভয়াবহ খবরটি এতদিন তাঁদের অসুস্থ মা খাদিজা বেগমকে জানানো হয়নি। মা যাতে কোনোভাবেই বিষয়টি টের না পান, সেজন্য প্রতিবেশীদের পর্যন্ত ওই বাড়িতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
চার ভাইকে হারিয়ে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন দেশে থাকা একমাত্র ভাই মাওলানা মো. এনামুল ইসলাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমরা পাঁচ ভাই একসঙ্গে ছিলাম। আমাদের মধ্যে মন আর মতের দারুণ মিল ছিল। এলাকায় এই নিয়ে আমাদের পরিবারের সুনামও ছিল। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল! চার ভাইকে আমি একসঙ্গে হারিয়ে ফেললাম। আজ আমরা পুরোপুরি নিঃস্ব। আমাদের মা-কে এখন কীভাবে বাঁচাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, চার ভাইয়ের মরদেহ ওমানের বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রবাসীদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা ও অনুদান প্রাপ্য, তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

















