নাহিদ ঝড়ে ওলটপালট পাকিস্তান, হেরে গেল ১০৪ রানে!

নাহিদ রানার ১৪৭ কিমি গতির বলটি কোনদিকে যাবে সেটি আঁচ করতে না পেরে ব্যাট উঁচিয়ে ছেড়ে দিতে গেলেন পাকিস্তানের ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ান। অফ স্টাম্পের বেশ বাইরে পিচ করে বলটা এমন করে বাঁক নিয়ে স্টাম্পে আঘাত হানবে এ কথা হয়তো ভাবেননি রিজওয়ান। কিন্তু সেটাই হলো, বল গিয়ে আঘাত হানলো স্ট্যাম্পে, লাফিয়ে উঠলো বেলস, সাথে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের দর্শকরাও।
আজ মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে এমন অনেক দৃশ্যেরই অবতারণা হয়েছে। বারবার লাফিয়ে উঠেছেন ক্রিকেটপাগল দর্শকরা। নিশ্চিয় টিভিতে যারা খেলা দেখেছেন তারাও লাফিয়েছেন।
বাংলাদেশের বোলাররা আজ ২৬৮ রানের লক্ষ্যে পাকিস্তানকে আটকে দিতে যার যা আছে, সব নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাসকিন আহমেদ আর টেস্টে দ্বিতীয় ৫ উইকেট নেওয়া নাহিদ রানা দেখালেন গতির ঝলক।
পঞ্চম দিনের উইকেটে দুই স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম যাননি। বাংলাদেশের পেস-স্পিন মেশানো তীরের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে সিরিজের প্রথম টেস্টে পাকিস্তান হেরে গেল ১০৪ রানে!
মিরপুর টেস্ট জিততে শেষ দিনে দুটি করণীয় ঠিক করেছিল বাংলাদেশ। এক. সকালে ২০-২৫ ওভার ব্যাটিং করে লিডটা ২৬০-২৭০ এ নিয়ে যাওয়া। দুই. পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের জন্য অন্তত ৭০-৭৫ ওভার বোলিংয়ের সময় হাতে রাখা, যেন তাদের অলআউট করার সুযোগ থাকে।

শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে টেস্টের শেষ অঙ্ক গুলো ঠিক এভাবেই মঞ্চস্থ হলো। প্রথম সেশনে ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে আরও ৮৮ রান যোগ করে ৯ উইকেটে ২৪০ রানে পৌঁছে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ।
চতুর্থ ইনিংসে পাকিস্তানের টার্গেট ২৬৮ রান। আলো থাকলে খেলা হওয়ার কথা সর্বোচ্চ সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত, শেষ দুই সেশনে ওভার হতে পারত ৭২টি। কিন্তু টেস্টের আগের চার দিনের কোনও দিনই খেলা বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের পর যায়নি। কাজেই যা করার তা পর্যাপ্ত আলো থাকতে থাকতেই করতে হতো, যেটি করে দেখিয়েছেন বাংলাদেশের বোলাররা।
বাংলাদেশের ইনিংসে ১৫০ বলে ৮৭ রানে আউট হয়ে যাওয়া অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের ‘ব্যাক টু ব্যাক’ সেঞ্চুরি না হওয়ার হতাশা থাকতে পারে। ৬৮ তম ওভারে নোমান আলীকে প্রথম বলেই রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে হলেন এলবিডব্লিউ, রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি নাজমুল।
তবে পাকিস্তানকে বিপদে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা গেছে ২৬৭ রানের লিডেই। লাঞ্চের মিনিট বিশেক আগে তাদের ব্যাটিংয়ে পাঠানোর পর বাকি কাজটা ছিল বোলারদের। নাজমুলের বিচক্ষণ অধিনায়কত্বে সেটা ভালোভাবে করতেও শুরু করে তারা। লাঞ্চের আগে ৪ ওভার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে ইমাম-উল হককে পাকিস্তান হারিয়েছে ইনিংসের প্রথম ওভারে। তাসকিনের বলে কট বিহাইন্ড হয়ে যান পাকিস্তানের ওপেনার।
১ উইকেটে ৬ রান নিয়ে লাঞ্চ। চা বিরতির আগে দ্বিতীয় সেশনে পাকিস্তান হারিয়েছে আরও ২ উইকেট, এই সেশনে রান যোগ হয় ১১০। প্রথম ইনিংসে অভিষেকেই সেঞ্চুরি পাওয়া আজান আওয়াইসকে ১৩তম ওভারে বোল্ড করে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ। আবদুল্লাহ ফজলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যাওয়া ৫৪ রানের জুটিটা ভেঙে যায় তাতে। দুই ওভার পর নাহিদ রানার বলে ব্যাটের কানায় লেগে কট বিহাইন্ড অধিনায়ক শান মাসুদও। পাকিস্তানের জন্য কঠিন হতে থাকে পরিস্থিতি, যেটিকে কিছুটা সহজ করে এনেছিল চতুর্থ উইকেটে ফজল-সালমান আগার ৫১ রানের জুটি।
৩২তম ওভারে ৬৬ রানে পৌঁছে যাওয়া ফজলকে এলবিডব্লিউ করে বড় ব্রেক থ্রুটা দেন বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। পরের ওভারেই আবার তাসকিন, এবার সাদমান ইসলামের হাতে গালিতে ক্যাচ সালমান আগা।
১২১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান তখন অনেকটাই পথ হারা। জয়ের চেয়ে ড্রয়ের দিকেই যেন চলে যায় তাদের মনোযোগ। পরের ১০ ওভারে সৌদ শাকিল আর মোহাম্মদ রিজওয়ানের খোলসে ঢুকে পড়া ব্যাটিংয়ে এই ১০ ওভারে যোগ হয় মাত্র ২৮ রান।
তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি পাকিস্তানের। ৪৫তম ওভারে আরেকবার বোলিংয়ে এসেই তাদের সব সম্ভাবনা ‘আগুনে’ পুড়িয়ে দেন নাহিদ। ৪৫, ৪৭ ও ৪৯—নিজের টানা তিন ওভারে মাত্র ৫ রান দিয়ে বাংলাদেশের গতির রাজা তুলে নেন সৌদ, রিজওয়ান আর নোমান আলীর উইকেট। মাঠে ইনিংসের ৪৮তম ওভারে তাইজুলও হাসান আলীকে এলবিডব্লিউ করায় ১৫২ থেকে ১৫৮, এই ৬ রানেই পাকিস্তান হারিয়ে ফেলে ৪ উইকেট। ম্যাচটাও বলতে গেলে ওখানেই শেষ।
কিন্তু নাহিদ তখনো ৫ উইকেট তোলার নেশায় মত্ত। ৫৩তম ওভারে শাহিন আফ্রিদিকে মাহমুদুল হাসানের ক্যাচ বানিয়ে সেটিও করে ফেললেন। সাথে বাংলাদেশকে দিলেন উদযাপনের উপলক্ষ্য।

















