ঢামেক হাসপাতালের গেটে বিনা চিকিৎসায় পড়ে আছে জীবন্ত লাশ

রাজধানীর ব্যস্ততম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক বীভৎস ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য। হাসপাতালের দেয়াল ঘেঁষে খোলা জায়গায় অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে আছেন এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে তিনি নিথর মরদেহ, কিন্তু খুব কাছে গেলে বোঝা যায় ক্ষীণ শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। শরীরজুড়ে পুরোনো ক্ষত আর পচন ধরা জখম থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। হাজার হাজার মাছি তার ক্ষতস্থানে জেঁকে বসেছে, অথচ সেগুলো তাড়ানোর মতো ন্যূনতম শক্তিও অবশিষ্ট নেই তার শরীরে। মাঝে মাঝে কেবল আঙুলের সামান্য নড়াচড়া জানান দিচ্ছে তিনি এখনো বেঁচে আছেন।
হাসপাতাল চত্বরে দিনের পর দিন এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকা এই মানুষটিকে দেখে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ ও হতবাক। নরসিংদীর মনোহরদী থেকে আসা নুরুল ইসলাম জানান, গত কয়েকদিন ধরেই লোকটিকে নড়াচড়াহীন অবস্থায় এখানে পড়ে থাকতে দেখছেন তিনি। পায়ে বড় ক্ষত নিয়ে বিনা চিকিৎসায় হাসপাতালের আঙিনায় একজন মানুষ কীভাবে এভাবে ধুঁকতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। অথচ দেশের বৃহত্তম এই সরকারি হাসপাতালকে ধরা হয় নিম্নবিত্ত ও অসহায় মানুষের শেষ ভরসার স্থল।
বাস্তব চিত্র বলছে, পরিচয়হীন ভবঘুরে ও দুস্থদের জন্য এই হাসপাতালে সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, ভবঘুরেদের জন্য আলাদা কোনো ওয়ার্ড বা বিশেষ ইউনিট না থাকায় অনেকেই খোলা চত্বরে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। শাহবাগ থানার তথ্যমতে, কেবল গত জানুয়ারি মাসেই হাসপাতাল চত্বর ও আশপাশ থেকে ১৫ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ডিএমপির রমনা বিভাগ জানায়, চানখারপুল, শহীদ মিনার ও বকশীবাজার এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া এসব মরদেহের অধিকাংশই অসুস্থ বা মাদকাসক্ত এবং শেষ পর্যন্ত আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
অবশ্য হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, ভাসমান ও পরিচয়হীন রোগীদের জন্য বর্তমানে একটি আলাদা কক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং সমাজকল্যাণ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসের পরও বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে একই স্থানে যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চিকিৎসা কেন্দ্রের প্রবেশপথেই যখন মানবিকতা এভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—অসহায় এই মানুষগুলোর কি তবে সুস্থ হয়ে বাঁচার কোনো অধিকার নেই? সচেতন মহলের প্রত্যাশা, নতুন সরকার দ্রুতই এসব ছিন্নমূল মানুষের জন্য একটি কার্যকর ও মানবিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।

















