বাংলাদেশের এক সময়ের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি একে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এর মাধ্যমে দেশ বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হবে।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাবেক এই পুলিশ প্রধানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলোর কার্যক্রমে গতি আসে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়, যার ভিত্তিতে তাকে দুবাইয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ মোট ছয়টি মামলা রয়েছে।
বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানান, গত ১২ জুন বাংলাদেশ পুলিশ দুবাই থেকে এই সংক্রান্ত একটি মেইল পায়। এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে যে, ইউএই-এর ফেডারেল আইন অনুযায়ী গ্রেফতারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট (প্রত্যর্পণের আবেদন) পাঠাতে হবে।
বর্তমানে এনসিবি ঢাকা এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দুদক ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত সংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করে অতি দ্রুত কূটনৈতিক চ্যানেলে এনসিবি আবুধাবির কাছে পাঠানো হবে এবং তাকে দ্রুততম সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে (ডিএমপি কমিশনার, র্যাব মহাপরিচালক এবং আইজিপি) এক দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালনকালে নানা ঘটনায় বারবার আলোচনা ও সমালোচনার কেন্দ্রে ছিলেন বেনজীর আহমেদ।
হেফাজত দমন ও বালুর ট্রাক বিতর্ক: ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের বিশাল সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করে আলোচনায় আসেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ। এছাড়া দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির কর্মসূচি ঠেকাতে গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে রাস্তা আটকে রাখার ঘটনায় তার তীব্র সমালোচনা হয়েছিল।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে বহু ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ অভিযোগ ওঠে। যদিও তিনি একে ‘সস্তা প্রচারণা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং বাহিনীতে অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েন।
বোট ক্লাব ও সাভানা রিসোর্ট বিতর্ক: ২০২১ সালে ঢাকার বোট ক্লাবে এক চিত্রনায়িকাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার পর জানা যায়, সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বেনজীর আহমেদ ওই বাণিজ্যিক ক্লাবের সভাপতি। এটি নিয়ে জাতীয় সংসদেও প্রশ্ন উঠেছিল।
"অপরাধীরা অপরাধ করবে আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা চেয়ে চেয়ে দেখবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কি অস্ত্র দেওয়া হয়েছে হাডুডু খেলার জন্য?" — ২০১৫ সালে র্যাব মহাপরিচালক থাকাকালীন বেনজীর আহমেদের আলোচিত বক্তব্য
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে আইজিপির পদ থেকে অবসরে যান বেনজীর আহমেদ। এর বছর দুয়েক পর ২০২৪ সালে ঢাকার একটি পত্রিকায় তার দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাপক সম্পদ অর্জনের খতিয়ান প্রকাশ হলে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সেই প্রেক্ষিতেই তিনি গোপনে দেশ ছেড়ে দুবাই চলে যান। পরবর্তীকালে আদালতের নির্দেশে গোপালগঞ্জে অবস্থিত তার মালিকানাধীন বিশাল ‘সাভানা রিসোর্ট ও ন্যাচারাল পার্ক’ এর নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন এবং তার ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি জব্দ করা হয়।
রোববার সাবেক এই আইজিপির গ্রেফতারের পর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে বেনজীর আহমেদকে দেশে এনে তার বিচার কাজ সম্পন্ন করা হবে।