শরীরে সামান্য হাত দিলেই মট করে ভেঙে যেত হাড়। এভাবে শৈশব থেকে এ পর্যন্ত শরীরের বিভিন্ন জায়গার হাড় ভেঙেছে মোট ২৯ বার। কোনো দিন নিজের পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি, দুই হাত আর শরীরের নিচের অংশও স্বাভাবিক নয়। তবে তীব্র শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর পরিবারের চরম দারিদ্র্য—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের কিশোর তামিম ইকবালকে (১৫)। সব বাধা পেরিয়ে সে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
তামিম ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার সাব্দালপুর গ্রামের শহিদুল ইসলাম ও বিলকিস নাহার দম্পতির ছোট ছেলে। সাব্দালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এবার সে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। বর্তমানে সে তালসার উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে জন্ম নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পরেই তামিমের ডান পা ভেঙে যায়। এরপর থেকে শরীরে একটু চাপ লাগলেই হাড় ভেঙে যেত। ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছরে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানের হাড় ভেঙেছে মোট ২৯ বার। এর মধ্যেই ২০১১ সালে তামিমের বাবা কিডনি রোগে আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে ২০১৭ ও ২০২৩ সালে দুবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি পুরোপুরি বিছানায় পড়ে যান।
বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে ও সংসার বাঁচাতে তামিমের বড় ভাই বদিউজ্জামান বিথু নিজের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে অন্যের দোকানে কাজ শুরু করেন। সংসারের এই চরম অনটনের মধ্যেও পড়াশোনা বন্ধ করতে রাজি হয়নি তামিম। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে ২০২৩ সাল থেকে তাদের বাড়িতে থাকা বাবার পুরোনো ছোট্ট দোকানটিতে কেনাবেচা শুরু করে সে। মাঝেমধ্যে মা বিলকিস নাহারও দোকানে বসেন।
তামিম জানায়, এই দোকান থেকে মাসে তার ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় হয়। এই টাকা দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি সংসারেও কিছুটা সহযোগিতা করে সে। মাত্র চার শতক জমির ওপর টিনের চালের ঘরে তাদের পুরো পরিবারের বসবাস।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তামিম কখনোই নিয়মিত বিদ্যালয়ে ক্লাস করতে পারেনি। বড় ভাই বদিউজ্জামান বিথু বলেন, 'বাড়ি থেকে নসিমন গাড়িতে করে তামিমকে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে আসি। এরপর কোলে করে কেন্দ্রের ভেতরে ওর আসনে বসিয়ে দিয়ে আসি। পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি বাইরে অপেক্ষা করি। সবাই হল থেকে বের হয়ে গেলে আবার ভেতরে গিয়ে ওকে কোলে করে বাড়িতে নিয়ে আসি। আমাদের আশা, তামিম এবার ভালো ফল করবে।'
তামিমের এই অদম্য লড়াইকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন তার সহপাঠী ও কেন্দ্রের অন্য পরীক্ষার্থীরা। তামিমের সহপাঠী ও একই বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থী আল-আমিন বলে, 'আমরা সামান্য একটু অসুস্থ হলেই পড়াশোনা করতে চাই না। আর তামিমকে আমরা বছরের পর বছর ধরে এই কষ্ট করতে দেখছি। ও আমাদের ক্লাসের সবার জন্য একটা বড় অনুপ্রেরণা।'
সাব্দালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. হাসমত আলী বলেন, 'তামিম খুবই মেধাবী ও ভদ্র একটি ছেলে। পড়াশোনার প্রতি ওর তীব্র আগ্রহ। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও এই শরীর নিয়ে সে যেভাবে লড়াই করছে, তা অবিশ্বাস্য। বিদ্যালয় থেকে আমরা ওকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছি। সরকারি বা বেসরকারিভাবে একটু পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তামিম ভবিষ্যতে অনেক দূর যেতে পারবে।'
ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তামিম বলে, 'আমি কখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারিনি, নিজের পড়ার খরচ নিজেই চালাই। বাবা আর ভাইয়ের সহযোগিতাই আমার পথচলার শক্তি। আমি ভালো ফল করে ভবিষ্যতে একটা সরকারি চাকরি করতে চাই, যাতে আমার এই দরিদ্র পরিবারের হাল ধরতে পারি।'