ইরানের খুব কাছেই আছে মার্কিন নৌবহর। যেকোনো সময় তেহরানে হামলা চালাতে প্রস্তুত ট্রাম্পের রণতরী। এমন বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে।
এমন পরিস্থিতিতেও আশার আলো দেখাচ্ছেন ট্রাম্প। তিনি আশাবাদী- খুব সম্ভবত ইরানে হামলার প্রয়োজন পড়বে না। শুক্রবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা এএফপি।
এর আগে বুধবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তেহরানের 'সময় ফুরিয়ে আসছে'। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের সঙ্গে কথা বলছেন। আশ্বস্ত করেন, এখনো সামরিক অভিযান এড়ানোর উপায় আছে।
বৃহস্পতিবার স্ত্রী মেলানিয়ার জীবন নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তিনি বলেছেন, 'আমি কথা বলেছি আগে। আরও কথা বলার পরিকল্পনা করছি। ইরান নামে একটি জায়গা আছে। সেখানে একটি সেনাদল রওনা হয়েছে। তবে আমি আশাবাদী, তাদেরকে ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না।’
ডিসেম্বরের শেষের দিকে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। জানুয়ারির ৮ ও ৯ তারিখে পরিস্থিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। সে সময় বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দেন ট্রাম্প।
তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকিগুলো মূলত পরমাণু কর্মসূচিকে ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের মতে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতি বড় হুমকি।
ইরান গোপনে 'পারমাণবিক বোমা' ও অন্যান্য অস্ত্র তৈরি করছে- এমন দাবি প্রায়ই করেন ইসরায়েলি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যদিও অদ্যাবধি এ বিষয়ে কোনও সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেননি তিনি।
অন্যদিকে তেহরান বলছে, তারা শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য পরমাণু সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং তাদের হাতে থাকা তেজস্ক্রিয় উপাদানের সব তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ইরানের দাবি, শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য পরমাণু সমৃদ্ধ করার অধিকার সব দেশের আছে এবং বাইরের কোনও দেশ এ বিষয়টিতে নাক গলাতে পারে না।
বুধবার ট্রাম্প হুমকি দেন, ইরানের জন্য পরমাণু চুক্তিতে সই দেওয়ার সময় ফুরিয়ে আসছে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের পূর্বাঞ্চলে মোতায়েন করা নৌবহর ইরানে হামলা চালাতে 'প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম।'
গত বছরের জুনে ইসরায়েল-ইরানের ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিয়েছিল। ইরানের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মাদ আকরামিনিয়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ওই যুদ্ধে মার্কিনিরা অংশ নিলেও তাদেরকে শুধু আংশিক জবাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আবারও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে হামলা এলে তাৎক্ষণিকভাবে এবং পূর্ণাঙ্গ জবাব দেবে তেহরান।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকরামিনিয়া রাষ্ট্রীয় টিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, 'মার্কিন রণতরীগুলোর গুরুতর দুর্বলতা আছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অসংখ্য মার্কিন সেনা ঘাঁটি আমাদের মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে রয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমেরিকানরা যদি হিসাবে ভুল করে তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, ট্রাম্প যেমনটা ভাবছেন, সেরকম কিছুই হবে না। দ্রুত অভিযান চালাবেন আর দুই ঘণ্টা পর টুইট করে বলবেন, অভিযান শেষ—পরিস্থিতি এমন হবে না।'
মার্কিন সেনাঘাঁটি আছে এমন একটি উপসাগরীয় দেশের এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশংকা 'খুবই স্পষ্ট'।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, 'এতে পুরো অঞ্চলে গোলযোগ দেখা দেবে। এটা শুধু এ অঞ্চলের অর্থনীতিকেই বিঘ্নিত করবে না। যুক্তরাষ্ট্রও বিপদে পড়বে। কারণ তেল ও গ্যাসের দাম আকাশ ছোঁবে।'
কাতারের নেতা শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ফোনে আলোচনা করেছেন। কাতার নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দুই নেতা ফোনে 'ওয়াশিংটন-তেহরানের টানাপোড়েন কমিয়ে আনা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উপায়' খুঁজতে আলোচনা করেছেন।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনার মধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। উভয় পক্ষকে পরমাণু চুক্তিতে সম্মত হতে অনুরোধ করে আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, 'আপনারা এই সংকট এড়ান। যা পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।'
শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আঙ্কারা সফরে যাচ্ছেন। সফরে তার সাথে বৈঠক করবেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। বৈঠকে ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে আলোচনার আয়োজন ও মধ্যস্থতার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব রাখবেন হাকান।