সব ক্ষেত্রে গণতন্ত্র ও জবাবদিহির চর্চা চালু রাখতে হবে: তারেক রহমান

আগামীতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি জনগণের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। শনিবার সকালে রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে দেশের জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর সম্পাদকদের সাথে এটি তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়।
এসময় তিনি বলেন, রাজনীতি শুধু সেমিনার আর সিম্পোজিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সংবিধান ও আইন সংস্কারের পাশাপাশি মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের আরও বেশি ভাবতে হবে।
তারেক রহমান ভবিষ্যতে বিএনপির দেশ পরিচালনার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিশেষ করে নারী উন্নয়ন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কল্যাণ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সংস্কার নিয়ে তার ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগামী ২২ তারিখ থেকে আমরা আমাদের সব রকম পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের সামনে যাব।
ফ্যামিলি কার্ড ও নারীর ক্ষমতায়ন
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আগামী নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করতে পারলে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রায় চার কোটি পরিবার আছে। আমরা ফ্যামিলি কার্ড চালু করব। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের নারীদেরকে রাষ্ট্র থেকে সহায়তা দেওয়া হবে। এটি সর্বজনীন (ইউনিভার্সাল) করা হবে।’
তিনি বলেন, মার্টিন লুথার কিং যেমন স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, তেমনি বিএনপিরও একটি স্বপ্ন বা পরিকল্পনা আছে। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী, তাদের বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিলেন, এখন বিএনপি তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে চায়।
কৃষক কার্ড ও কৃষি উন্নয়ন
দেশের কৃষকদের অবস্থার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত জমির মালিক এমন কৃষকের সংখ্যা প্রায় এক কোটির মতো। বিগত বিএনপি সরকার কৃষকদের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। আগামীতে আমরা কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি কার্ড চালু করব। এর মাধ্যমে সার, বীজ ও কৃষি উপকরণে ভর্তুকিসহ নানা সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।’
স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ
স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিওর’ বা প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম—এই নীতিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ইউরোপের দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও হেলথ কেয়ার বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছি। এর মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই হবেন নারী। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করবেন, পুষ্টিকর খাবার ও জীবনযাপন সম্পর্কে পরামর্শ দেবেন। একই সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও তারা ভূমিকা রাখবেন।’ এ সম্পর্কে তিনি বলনে, আমাদের সম্পদ সীমিত, তাই জনসংখ্যাকে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা জরুরি।
প্রবাসী কল্যাণ ও জনশক্তি রপ্তানি
প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ৮-১০ লাখ মানুষ বিদেশে যান, যার বড় অংশই অদক্ষ। তাদের যদি ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো যায়, তবে জনশক্তি রপ্তানির আয় অনেক বাড়বে।
তিনি বলেন, আমরা ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলোকে আধুনিকায়ন করব। মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, ইউরোপ এমনকি চীনের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের ভাষা ও দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
এ ছাড়া প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বন্ড সুবিধা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
আইটি পার্ক ও ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধা
তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও আইটি খাতের বিকাশে বিএনপির পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের আইটি পার্কগুলোকে কাজে লাগিয়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ছোট ছোট অফিস স্পেস ও ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা দেওয়া হবে।
তিনি জানান, অনেকে মেসে বা বাসায় বসে কাজ করেন। তাদের যদি একটা ব্যবসায়িক ঠিকানা বা স্পেস দেওয়া যায়, তবে তারা আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারবেন। এছাড়া ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের টাকা দেশে আনার ক্ষেত্রে পেপ্যালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর সমস্যা সমাধানে আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। এতে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় বাড়বে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও জবাবদিহি
যেকোনো মূল্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘গণতন্ত্র ও জবাবদিহির চর্চা চালু রাখতে হবে। জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার বা ট্রেড বডি—সবখানেই নির্বাচন হতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে দেশের সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চাই না। হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি দেশের জন্য কী ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনে, তা আমরা দেখেছি। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসতে হবে।’
সংস্কার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, সংস্কারের তিনটি অংশ রয়েছে—সাংবিধানিক, আইনগত এবং মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তা। তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক ও আইনগত সংস্কার নিয়ে আমরা অনেক আলোচনা করেছি। কিন্তু মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও সন্তানদের শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা কিছুটা কম হয়েছে।’
বিএনপি চেয়ারপারসন আরও বলেন, ‘আমরা শুধু রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম বা তর্কবিতর্ক করছি, যার প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের প্রাত্যহিক চাওয়া-পাওয়া ও প্রয়োজনগুলো নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর আরও বেশি আলোচনা করা উচিত। এসব বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি আরও সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন।’
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক রেজাউল করিম রনি, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদুর রহমান, নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর, কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, যুগান্তর সম্পাদক আব্দুল হাই সিকদার, সাংবাদিক মমতাজ বিলকিস, ঢাকা স্ট্রিম এর সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম, বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমান এবং বিএনপি বিটের সিনিয়র সাংবাদিকরা।


















