সংযমকালে সুষমার সংলাপ: রমজানের খাদ্যতত্ত্ব, রোগব্যবস্থাপনা ও বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞা

রমজান কেবল আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির মাস নয়; এটি মানবদেহের বিপাকীয় পুনর্গঠনেরও এক অনন্য অধ্যায়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস দেহকে বাধ্য করে শক্তির উৎস বদলাতে—গ্লাইকোজেন ভাণ্ডার থেকে লিপিড অক্সিডেশনে, তা-ও এক শৃঙ্খলাবদ্ধ জৈব-রসায়নের মধ্য দিয়ে। এই অভিযোজন যেন কল্যাণকর হয়, তার জন্য খাদ্যাভ্যাসে প্রয়োজন প্রজ্ঞা, পরিমিতিবোধ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। আজ আলোচনা করব রমজান মাসে আমাদের খাদ্যাভ্যাস কেমন হবে; তা নিয়ে।
সেহরি: স্থিতিশীল শক্তির প্রজ্ঞাময় প্রস্তাবনা
সেহরি হওয়া উচিত ধীরস্থির শক্তির আধার। জটিল কার্বোহাইড্রেট (লাল চাল, ওটস, আটার রুটি) রক্তে গ্লুকোজের ধীর নিঃসরণ নিশ্চিত করে। উচ্চমানের প্রোটিন যেমন- ডিম, ডাল, দই, মাছ; তৃপ্তি দীর্ঘায়িত করে ও পেশি সুরক্ষায় সহায়ক। আঁশসমৃদ্ধ সবজি ও ফল অন্ত্রের গতিশীলতা সচল রাখে। পর্যাপ্ত পানি—কিন্তু একসাথে নয়, ধাপে ধাপে। অতিরিক্ত লবণাক্ত ও অতিমিষ্ট খাদ্য তৃষ্ণা বাড়ায়; অতিরিক্ত চা-কফি মূত্রবর্ধক প্রভাবে জলশূন্যতা ত্বরান্বিত করে। সেহরি যেন হয় সংযত, সুষম ও সুসংবদ্ধ।
ইফতার: আকস্মিক ভোজন নয়, ধীর পুনরারম্ভ
দীর্ঘ সময় আহার না করে থাকার পর পাকস্থলী সংবেদনশীল থাকে। তাই ইফতার শুরু হওয়া উচিত খেজুর ও পানি দিয়ে। কারণ আপনার দেহে দ্রুত গ্লুকোজ পুনঃস্থাপন করে এই ফলটি। এর সঙ্গে হালকা স্যুপ বা ফল খেতে পারেন। তারপর প্রধান আহার করা যায়। এতে অল্প পরিমাণ ভাত/রুটি, ছোলা, শাকসবজি, প্রোটিনের উৎস (মাছ/মুরগি/ডাল) খেতে পারেন। ভাজাপোড়া ও অতিচর্বিযুক্ত খাদ্য খেলেও তা সীমিত পরিমাণে। হঠাৎ অতিভোজন গ্যাস্ট্রিক এসিডিটি, অম্বল ও অস্বস্তির জন্ম দেয়। ধীর আহার ও সচেতন পরিমিতি পরিপাকতন্ত্রকে স্বস্তি দেয়।
রাতের খাবার: হালকা, প্রশান্ত ও নিদ্রাবান্ধব
তারাবির পর ভারী ভোজন নিদ্রার গুণগত মান ব্যাহত করে। রাতের খাবার হোক হালকা প্রোটিন, অল্প কার্বোহাইড্রেট, অতিরিক্ত মশলাবর্জিত। এতে রক্তের শর্করা স্থিতিশীল থাকে ও ঘুম গভীর হয়।
বিশেষ রোগাবস্থা ও রমজান: সতর্কতার শাস্ত্র
ডায়াবেটিস:
রমজানে ডায়াবেটিস রোগীর জন্য প্রধান ঝুঁকি—হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে শর্করা কমে যাওয়া) ও হাইপারগ্লাইসেমিয়া (অতিরিক্ত বৃদ্ধি)।
ইনসুলিন ব্যবস্থাপনা:
সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শে ডোজ ও সময়সূচি সামঞ্জস্য করা হয়। রোজা থেকেও ইনসুলিন গ্রহণ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে সকালের ডোজ ইফতারের সময়ে স্থানান্তরিত হয়; ইনসুলিনের ডোজ সমন্বয় প্রয়োজনও হতে পারে। স্বেচ্ছায় ডোজ পরিবর্তন বিপজ্জনক।
ব্লাড টেস্ট কি রোজা ভঙ্গ করে?
ফিকহ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধিকাংশ ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে- আঙুলের সামান্য রক্ত নিয়ে গ্লুকোজ পরীক্ষা করলে রোজা ভঙ্গ হয় না, কারণ এটি পুষ্টি গ্রহণ নয়। বরং নিয়মিত মনিটরিং জীবনরক্ষাকারী।
কখন রোজা ভাঙা জরুরি?
রক্তে শর্করা ৭০ mg/dl-এর নিচে নামলে ও ৩০০ mg/dl-এর ওপরে উঠলে, তীব্র দুর্বলতা, ঘাম, বিভ্রান্তি দেখা দিলে। জীবন রক্ষা শরীয়তের মৌলিক নীতি; সুতরাং স্বাস্থ্যঝুঁকি হলে রোজা ভাঙা বৈধ।
উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ
লবণ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত তরল, ও নিয়মিত ওষুধ সেবন অপরিহার্য। ডায়ুরেটিক সেবনকারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে সময় নির্ধারণ করা উচিত।
গ্যাস্ট্রিক ও আলসার
অতিভোজন, ঝাল-চর্বি এড়িয়ে চলা; প্রয়োজনে এসিডনিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ ইফতার ও সেহরিতে সেবন করা যায়।
কিডনি রোগ
পানিশূন্যতা এড়ানো সর্বাগ্রে প্রয়োজন। অনেক কিডনি রোগীর ক্ষেত্রে রোজা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে; এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত অপরিহার্য।
গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদান
শারীরিক অবস্থা, রক্তস্বল্পতা ও পুষ্টিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। দুর্বলতা বা শিশুর ওজনহ্রাস দেখা দিলে রোজা স্থগিত করাই নিরাপদ।
উপসংহার: সংযমের বিজ্ঞান
রমজান দেহকে শেখায় বিপাকীয় শৃঙ্খলা, মনকে শেখায় সংযম। কিন্তু আধ্যাত্মিক সাধনা যেন শারীরিক বিপর্যয়ে পরিণত না হয়—তার জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞা, চিকিৎসক-পরামর্শ ও সচেতন খাদ্যসংস্কৃতি।সুষম সেহরি, সংযত ইফতার, নিয়ন্ত্রিত রাতের আহার এবং রোগাবস্থায় বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত—এই চার স্তম্ভেই রমজানের স্বাস্থ্যরক্ষা নির্ভরশীল। সংযম যদি হয় সুবিবেচিত, তবে রমজান কেবল ইবাদতের মাস নয়—এটি হয়ে উঠতে পারে দেহ-মন পুনর্নির্মাণের এক শাস্ত্রসম্মত, শোভন ও সুদূরপ্রসারী যাত্রা।
লেখক: মাহমুদা ফেরদৌস পরমা, পুষ্টিবিদ।

















