মাশরাফি বিন মর্তুজা বাংলাদেশের ক্রিকেটে শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং একটি আবেগের নাম। প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় এবং কীভাবে একটি দলকে দলগতভাবে লড়তে শেখাতে হয়, মাশরাফি তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড় মাশরাফি বিন মর্তুজা। তিনি শুধু একজন গতিশীল পেসারই ছিলেন না, তার লড়াকু মানসিকতা এবং জাদুকরী নেতৃত্ব বাংলাদেশ দলকে ক্রিকেট বিশ্বের এক সমীহ জাগানিয়া শক্তিতে রূপান্তর করেছিল। ৫ অক্টোবর ১৯৮৩ সালে নড়াইলে জন্ম নেওয়া এই ক্রিকেটার ক্রীড়াঙ্গন জয় করে পরবর্তীতে রাজনীতিতেও প্রবেশ করেন।
মাশরাফি বিন মোর্ত্তজার ডাকনাম কৌশিক। ডানহাতি ফাস্ট-মিডিয়াম বোলার ও লোয়ার-অর্ডারের এই ব্যাটার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
কোনো প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০০১ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সরাসরি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে মাশরাফির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে। গতি এবং বাউন্স দিয়ে তিনি শুরুতেই ক্রিকেট বিশ্বের নজর কাড়েন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রকৃত 'জেনুইন ফাস্ট বোলার' হিসেবে আবির্ভূত হন।
২০০৬ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে ২৬ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন, যা তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের ওডিআই ইতিহাসের সেরা বোলিং ফিগার ছিল। ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৪টি উইকেট শিকার করে ম্যাচের নায়ক বনে যান মাশরাফি।
মাশরাফির দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ওডিআই ফরম্যাটেই সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল ও দীর্ঘস্থায়ী ছিলেন।
মাশরাফি বিন মর্তুজাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ওডিআই অধিনায়ক হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১৪ সালে দ্বিতীয় দফায় যখন তিনি সীমিত ওভারের অধিনায়কত্ব পান, তখন থেকে বাংলাদেশ দলের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আসে। তার অধীনে বাংলাদেশ টানা দ্বিপাক্ষিক সিরিজে বড় বড় পরাশক্তিদের হারাতে শুরু করে। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ৮৮টি ওডিআই ম্যাচের মধ্যে ৫০টিতে জয় লাভ করে (জয়ের হার ৫৮.১৩%)।
২০১৫ সালের আইসিসি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল এবং ২০১৬ ও ২০১৮ সালের এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ—যার সবকটিই এসেছিল মাশরাফির হাত ধরে। ওডিআই অধিনায়ক ও বিশ্বের ৫ম বোলার হিসেবে ১০০টি উইকেট শিকারের গৌরব অর্জন করেন তিনি।
মাশরাফির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ছিল ইনজুরি। দুই হাঁটু ও গোড়ালিতে মোট ১০টিরও বেশি অস্ত্রোপচার এবং ১৫ বারেরও বেশি বড় ইনজুরির শিকার হয়েছেন তিনি। চিকিৎসকরা বারবার ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও, অদম্য ইচ্ছা ও জেদের জোরে প্রতিবারই তিনি মাঠে ফিরে এসেছেন। ইনজুরির কারণে পরবর্তীতে গতি কিছুটা কমিয়ে লাইন ও লেংথের ওপর নির্ভর করে বোলিং অ্যাকশন পরিবর্তন করতে বাধ্য হন তিনি।
মাশরাফি ২০১৭ সালে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। এরপর ২০২০ সালের মার্চ মাসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ওডিআই দলের অধিনায়কত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন।
ক্রিকেটের পাশাপাশি তিনি সমাজসেবা ও রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০১৮ সালের শেষের দিকে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নড়াইল-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সালের শুরুতেও পুনরায় নির্বাচিত হয়ে সংসদের 'হুইপ' হিসেবে দায়িত্ব পান। তবে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও জাতীয় সংসদ বিলুপ্তির মাধ্যমে তার সংসদ সদস্য পদের অবসান ঘটে। এছাড়া নিজ এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য ও সার্বিক উন্নয়নে তিনি 'নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন' নামক একটি মানবিক সংস্থা পরিচালনা করছেন।