শান্তির পথ খুঁজতে ওমানে বৈঠক করবেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কর্মকর্তারা

সামরিক অস্থিরতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সরাসরি আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন। শিগগিরই দুই দেশের মধ্যে ওমানে আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত মাসে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে সরকারের সহিংস অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পর উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনা হতে হচ্ছে।
এতে ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গত সপ্তাহে তিনি বলেছেন, তার দেশের সশস্ত্র বাহিনী ‘আঙুল ট্রিগারে রেখেই’ প্রস্তুত আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনায় থাকবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান মঙ্গলবার বলেছেন, যদি ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ থাকে তাহলে তিনি আরাগচিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক’ আলোচনা চালাতে নির্দেশ দিয়েছেন।
আলোচনায় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তুলবে তেহরান। সরকারবিরোধীরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে দেশটির শাসকদের জন্য তা হবে জীবনরক্ষার সুযোগ।
আলোচনার স্থান ও পরিসর নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় এক পর্যায়ে তাদের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বিষয়টি এগোচ্ছে।
বিবিসি বলছে, দুই দেশের অবস্থান এখনো অনেক দূরে। আলোচনা সফল হলে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করতে হবে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ পরিত্যাগ করতে হবে। আলোচনায় ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি দেশটির সমর্থন এবং নিজ নাগরিকদের সঙ্গে আচরণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি আছে।
তবে ইরান বলেছে, আলোচনা কেবল তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই মতপার্থক্যের আদৌ সমাধান হয়েছে কি না তা স্পষ্ট হয়নি।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এর আগে হুমকি দিয়েছিলেন, কোনও চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমা হামলা চালাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হাজার হাজার সেনা, একটি বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে।
ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হামলা হলে তারা শক্ত জবাব দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানবে।
গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের পর এটিই হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কর্মকর্তাদের প্রথম বৈঠক। ওই যুদ্ধে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরান বলছে, ওই হামলার পর তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
বিবিসি লিখেছে, নিজের দেশে চাপের মুখে থাকা ইরানি নেতৃত্বের জন্য এই আলোচনা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ঠেকানোর শেষ সুযোগ। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বর্তমান সরকার সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন শুরু করলে ট্রাম্প ইরানে হামলার হুমকি দেন। গভীর অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এসব বিক্ষোভে অনেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান দাবি করেছেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি বলেছে, তারা কমপক্ষে ৬,৮৮৩ জনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এছাড়াও ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বর্তমান সংকট আবারও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনায় এনেছে, যা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিন থেকে বিরোধ চলমান।
তবে শুরু থেকেই ইরান দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্যে শান্তিপূর্ণ। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অভিযোগ করে আসছে, এটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অংশ।
ইরান বলছে, নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ৪০০ কেজি (৮৮০ পাউন্ড) মজুত তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর আহ্বান তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিছু ছাড় দিতে তারা রাজি হতে পারেন। এর মধ্যে থাকতে পারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য একটি আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম গঠন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আগে এ প্রস্তাব করা হয়েছিল, তবে ইসরায়েলের আকস্মিক যুদ্ধ শুরুর পর তা ভেস্তে যায়।
একইসঙ্গে ইরান বলেছে, তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং এ অঞ্চলে তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধের দাবি গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। মিত্রগোষ্ঠীর জোটকে তেহরান ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বলে, যার মধ্যে গাজায় হামাস, ইরাকে মিলিশিয়া, লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনে হুথিরা রয়েছে।
আলোচনার ফলের ওপর নির্ভর করে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি থেকে সরে আসার একটি পথ তৈরি হতে পারে।
আঞ্চলিক দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আরও বড় সংঘাত বা ইরানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। তারা সতর্ক করেছে, কেবল আকাশপথের শক্তি দিয়ে ইরানি নেতৃত্বকে উৎখাত করা সম্ভব নয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত- এমন প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বুধবার এনবিসি নিউজকে বলেন, ‘আমি বলব, তার খুবই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। হ্যাঁ, হওয়া উচিত।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘অর্থবহ কিছু অর্জন করতে হলে আলোচনা অবশ্যই পারমাণবিক বিষয়ের বাইরে যেতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই তাদের সঙ্গে চুক্তি করা সম্ভব কি না, তবে আমরা চেষ্টা করে দেখতে চাই। কিছু করা যায় কি না তা খতিয়ে দেখার মধ্যে আমরা কোনো ক্ষতি দেখি না।’
উত্তেজনা কমানোর জন্য মিশর, তুরস্ক ও কাতারের নেতৃত্বে প্রথমে ইস্তাম্বুলে আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে ইরান আলোচনার স্থান ওমানে সরানোর অনুরোধ জানায়, যেখানে গত বছরও আলোচনা হয়েছিল। তেহরান এ আলোচনাকে কেবল ইরানি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে বলেছে।

















