১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। সকালের সূর্যটা তখনও মাথার ওপর ওঠেনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রধান ফটকের সামনে বারুদের গন্ধ আর বুটের শব্দে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস। একদিকে আইয়ুববিরোধী স্লোগানে উত্তাল হাজারো ছাত্র, অন্যদিকে উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র হাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সেই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে ইতিহাসের এক অমোঘ ও সাহসী ঘোষণা দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. সৈয়দ মুহাম্মদ শামসুজ্জোহা। তিনি মারমুখী সেনাসদস্যদের লক্ষ্য করে চিৎকার করে বলেছিলেন— "আমার ছাত্রদের গায়ে গুলি লাগার আগে যেন সেই গুলি আমার বুকে বিঁধে।"
ঘাতকের বুলেট সেদিন তাঁর সেই আর্তি শোনেনি, বরং তাঁর বুকই বেছে নিয়েছিল। নিজের জীবন দিয়ে ছাত্রদের প্রাণ বাঁচিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। আজ সেই রক্তস্নাত ১৮ ফেব্রুয়ারি, 'জোহা দিবস'। ৫৬ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর সেই অকুতোভয় আত্মত্যাগ আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
ড. জোহার জীবন ছিল মেধা আর দেশপ্রেমের এক অনন্য উপাখ্যান। ১৯৩৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায় জন্ম নেওয়া এই কৃতি সন্তান দেশভাগের পর এ দেশে চলে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে তিনি পাড়ি জমান লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে। সেখান থেকে পিএইচডি শেষ করার পর লন্ডনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর কাছে শিক্ষকতার প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু মাটির টানে, দেশের তরুণ প্রজন্মকে গড়ে তোলার স্বপ্নে ১৯৬১ সালে তিনি ফিরে আসেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ছাত্রদের কাছে তিনি কেবল শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন এক পরম নির্ভরতার আশ্রয়।
১৯৬৯ সাল। পূর্ব পাকিস্তান তখন এক আগ্নেয়গিরি। ২০ জানুয়ারি আসাদ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যাকাণ্ডের পর পুরো দেশ তখন আইয়ুব শাহীর পতনের দাবিতে উত্তাল। এর আঁচ লাগে রাজশাহীতেও। ১৮ ফেব্রুয়ারির আগের দিন, অর্থাৎ ১৭ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গুলিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ছাত্র আহত হন। রক্তাক্ত ছাত্রদের দেখে ড. জোহা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। ছাত্রদের সেই রক্তমাখা জামা হাতে তুলে নিয়ে তিনি সহকর্মীদের সামনে শপথ করেছিলেন— আর কোনো ছাত্রের রক্ত তিনি ঝরতে দেবেন না। সেই রাতেই তিনি বলেছিলেন, "প্রক্টর হিসেবে আমি ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে আমার পদের কোনো মূল্য নেই।"
১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে নামার চেষ্টা করলে সেনাসদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ব্যারিকেড দেয়। পরিস্থিতি যখন রণক্ষেত্রে রূপ নেওয়ার উপক্রম, তখন ড. জোহা সেখানে উপস্থিত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে, তিনি দুই হাত প্রসারিত করে সেনাসদস্যদের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বারবার নিজের পরিচয় দিয়ে ইংরেজিতে বলছিলেন, "Don’t shoot! I am the Proctor. My students are innocent. If you want to shoot, shoot me first."
কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা কোনো মানবিকতা মানেনি। তৎকালীন ক্যাপ্টেন হাদির নির্দেশে ড. জোহাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি চালানো হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এই মহান শিক্ষক। ঘাতকরা সেখানেই থামেনি; বুলেটে বিদ্ধ এই শিক্ষকের নিথর দেহকে তারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলেও বিকেলে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ড. জোহার এই মহাপ্রয়াণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক টার্নিং পয়েন্ট। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে গণঅভ্যুত্থান আরও বেগবান হয়, যা শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খানের পতন ত্বরান্বিত করে। স্বাধীন বাংলাদেশে ড. জোহাকে 'প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এবং সচেতন নাগরিক সমাজ দাবি জানিয়ে আসছে, ১৮ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে 'জাতীয় শিক্ষক দিবস' হিসেবে ঘোষণা করার। কারণ, একজন শিক্ষক যে নিজের সন্তানদের (ছাত্রদের) জন্য ঢাল হয়ে জীবন দিতে পারেন, তার এমন উজ্জ্বল উদাহরণ বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৯ জানুয়ারি শিক্ষক দিবস পালিত হলেও, ত্যাগের মহিমা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৮ ফেব্রুয়ারির দাবিটি এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রশাসনিক ভবনের সামনেই শায়িত আছেন ড. জোহা। তাঁর সমাধির পাশে দাঁড়ালে আজও যেন সেই সাহসী গর্জন প্রতিধ্বনিত হয়। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষকদের কাছে ড. জোহা কেবল একটি নাম নয়, একটি দর্শন। তিনি শিখিয়েছেন শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি সর্বোচ্চ মানবিক দায়িত্ব।
শহীদ ড. শামসুজ্জোহা তাঁর রক্তের বিনিময়ে এ দেশের শিক্ষক সমাজকে পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আজ ৫৬তম শাহাদাত বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে জাতি তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। সত্য, ন্যায় এবং ছাত্রদের প্রতি মমত্বের যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল প্রদীপ্ত শিখার মতো জ্বলবে।
বিনম্র শ্রদ্ধা, হে মহান শিক্ষক।