যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে ৮০ ডলারের নিচে নেমেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের চুক্তির পর গত কয়েক মাস ধরে অবরুদ্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাপক হারে বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজ নিজ দেশের পক্ষে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিন উভয় দেশ সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি পালন করবে এবং এর মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে।
এর আগে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সংঘাত শুরু হয়। এর জবাবে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয় এবং পাল্টা ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালায়। প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে চলা এই সংকটের পর, উভয় পক্ষ একটি ১৪ দফার অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ট্রানজিট রুট বলা হয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে চুক্তির পরপরই মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে এবং ইরান প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ টোল-মুক্ত ও উন্মুক্ত ঘোষণা করেছে। ইতোমধ্যে তিন দিন ধরে ৩টি সৌদি ট্যাংকারসহ বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে নিরাপদে এই প্রণালি অতিক্রম করেছে। খনি অপসারণ এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই রুটের জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার খবরে বিশ্ব বাজারে সরবরাহ সংকট কেটে যাওয়ার স্বস্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যুদ্ধের শুরুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
যুদ্ধের সময়ে যেখানে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছুঁয়েছিল, সেখানে এই চুক্তির প্রভাবে তা এক ধাক্কায় তা ৮০ ডলারের নিচে নেমেছে। বিখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংক তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করে জানিয়েছে, আগামী মাস নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম স্থায়ীভাবে ৮০ ডলারের নিচে থাকবে।
এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত কঠোর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরাসরি বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে শুরু করবে।
এছাড়াও ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত রাখা এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার শর্তে, তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক সহযোগীরা ইরানের যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠন করতে সম্মত হয়েছে।
এদিকে, গত কয়েক মাস ধরে জ্বালানির আকাশচুম্বী দামের কারণে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোতে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছিল। তেলের দাম ৮০ ডলারের নিচে আসায় আমদানিকারক দেশগুলোর আমদানি ব্যয় কমবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরণের স্বস্তি পাবে।
তবে চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু হলেও বাজার বিশ্লেষকরা এখনও পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নন। তারা বলছেন, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা জারির পর চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে সাময়িক সংশয় দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে ১৯ জুন যে চূড়ান্ত কারিগরি ফলোআপ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা দুই পক্ষের লজিস্টিক ও কৌশলগত কারণে স্থগিত হওয়ায় বাজারে আজ সামান্য মূল্যের ওঠানামা দেখা গেছে।
সাড়ে তিন মাস বন্ধ থাকার পর জাহাজগুলোর আন্তর্জাতিক বীমা পুনরায় চালু করা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বন্দরগুলোর কার্যক্ষমতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।