মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি: নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে পাঠানো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি চিঠি বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চিঠিতে ট্রাম্প ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামক বাণিজ্য চুক্তিটি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। তবে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা ও সংশয় দেখা দিয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর ৩৫ শতাংশ ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়। দীর্ঘ নয় মাস আলোচনার পর এই শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে উভয় দেশ একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুল্ক কমানোর আড়ালে বাংলাদেশ এমন কিছু শর্ত মেনে নিয়েছে যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে।
চুক্তির ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে আমেরিকা থেকে ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি, বছরে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য এবং ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে বাধ্য থাকবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (CPD)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এই সংখ্যাগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং কঠিন (concrete)। ভবিষ্যতে দেশের চাহিদা না থাকলেও এই কেনাকাটা থেকে পিছিয়ে আসা কঠিন হবে, কারণ সেক্ষেত্রে আবারও ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসানের মতে, বেসরকারি আমদানিকারকদের ভারত বা চীনের বদলে আমেরিকা থেকে পণ্য আনতে বাধ্য করা হলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। সরকার কি এই বাড়তি খরচের বা ভর্তুকির হিসাব করেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
চুক্তিতে কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং গভীর কৌশলগত শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন: নির্দিষ্ট কিছু দেশ (যেমন চীন) থেকে সামরিক কেনাকাটা কমিয়ে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো। আমেরিকার স্বার্থের সংঘাত আছে এমন দেশ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা জ্বালানি না কেনা। মার্কিন জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে চীন ও রাশিয়ার মতো দীর্ঘকালীন বন্ধুদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে ফাটল ধরতে পারে। বিশেষ করে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ থাকায় চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এই চুক্তিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। বিশেষ করে মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিকে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে ‘আমেরিকান পলিটিক্যাল ফেভার’ বা রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ই ছিল এই চুক্তির মূল লক্ষ্য।
একটি নির্বাচিত সরকার আসার ঠিক আগমুহূর্তে কেন এমন স্পর্শকাতর চুক্তি সই করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। যদিও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান নতুন বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তবুও এই চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন হবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং মার্কিন চাপের মুখে এই চুক্তি থেকে সরে আসা নতুন সরকারের জন্য একটি বিশাল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

















