মাটির মানুষ, সুরের সম্রাট: শাহ আবদুল করিমের ১১০তম জন্মদিন আজ

আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি। বসন্তের প্রথম প্রহরে প্রকৃতি যখন নতুন সাজে সেজেছে, ঠিক তখনই বাঙালির হৃদয়ে বেজে উঠছে কালনী নদীর তীরের সেই মরমী সুর। আজ বাংলা লোকসংগীতের ধ্রুবতারা, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১১০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯১৬ সালের এই দিনে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে এক নিভৃত পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন এই কালজয়ী সাধক। দারিদ্র্যের সাথে আজীবন লড়াই করা এই মানুষটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই কেবল প্রকৃতির পাঠশালা থেকে আহরণ করেছিলেন জীবনের গূঢ় দর্শন। শৈশবে রাখাল বালকের জীবন কাটানো করিমের বাঁশির সুরই একদিন হয়ে ওঠে কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন।
শাহ আবদুল করিম কেবল একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক। তার সৃষ্টির এক বিশাল অংশ জুড়ে আছে দেহতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক সাধনা, তবে তিনি সংসারবিবাগী ছিলেন না। তার গানে যেমন ফুটে উঠেছে স্রষ্টা ও সৃষ্টির বিচ্ছেদ, তেমনি প্রবলভাবে উঠে এসেছে শোষিত মানুষের আর্তনাদ ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক হিসেবে তিনি গেয়েছেন— “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটু গান গাইতাম।” তার এই সহজ ও সাবলীল বাচনভঙ্গিই তাকে সাধারণ মানুষের অতি কাছের মানুষে পরিণত করেছে।
সংগীতের বিশাল ভাণ্ডারে শাহ আবদুল করিম রেখে গেছেন দেড় সহস্রাধিক কালজয়ী গান। ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’, ‘গাড়ি চলে না চলে না’, ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’, ‘কে তোমার করিবে মায়া’ কিংবা ‘আমি কূলহারা কলঙ্কিনী’-র মতো গানগুলো এখন বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। লোকগানকে মেঠো পথ থেকে তুলে এনে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সাথে সমন্বয় করে শহুরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনপ্রিয় করার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের কাছেও তিনি এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস।
দীর্ঘ সংগীত সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ শাহ আবদুল করিম ২০০১ সালে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’। এ ছাড়াও তিনি অসংখ্য দেশি-বিদেশি সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে সিলেটের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাকে সমাহিত করা হয় তার প্রিয় উজানধল গ্রামের নিজ আঙিনায়। আজ তার জন্মদিনে রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। কালনী নদীর তীরে বসছে বাউল মেলা, যেখানে সুরের মূর্ছনায় স্মরণ করা হচ্ছে এই মহান মহাজনকে।

















