মব ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রস্তুত এক লাখ সেনা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬-কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নিরাপত্তার নিটোল চাদর গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। মব (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) সংস্কৃতি রোধ এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতা দমনে মাঠপর্যায়ে সেনাসদস্যের সংখ্যা বাড়িয়ে এক লাখে উন্নীত করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর এই বিশাল উপস্থিতি সাধারণ ভোটারদের মনে আস্থা ফেরানোর পাশাপাশি অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের জন্য কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন এসব তথ্য জানান।
নির্বাচনের আগে, ভোটের দিন এবং পরবর্তী সময়ে ‘মব’ বা উগ্র জনতার হামলা নিয়ে জনমনে যে শঙ্কা রয়েছে, তা নিরসনে সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন জানান, মব বা যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ রয়েছে।
তিনি বলেন, “যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের প্রয়োজন হয়, তবে আমরা আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে ক্রমান্বয়ে বল প্রয়োগের মাত্রা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া অনুসরণ করব।” মব সামলাতে সেনাসদস্যদের এবার বিশেষ নন-লিথাল ওয়েপন (অপ্রাণঘাতী অস্ত্র) এবং রায়ট কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট বা দাঙ্গা দমনের আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে।
নির্বাচনী পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে সেনাসদস্যের সংখ্যা: ১০ জানুয়ারি: প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৫ হাজার সেনা মোতায়েন। ২০ জানুয়ারি: সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে এক লাখে উন্নীত করা হয়। সহযোগী বাহিনী: নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩,৭৩০ জন সদস্যও নির্বাচনী দায়িত্বে সক্রিয় রয়েছেন।
সারাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টিতেই সেনাবাহিনীর অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। ৪১১টি উপজেলা এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে মোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যা কেন্দ্রভিত্তিক ও উপজেলাভিত্তিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাবাহিনীর অভিযানে ইতোমধ্যে বড় সাফল্য এসেছে। গত ১৪ দিনে প্রায় দেড় শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১০,১৫২টি অস্ত্র এবং প্রায় ৩ লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। নাশকতার পরিকল্পনাকারী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীসহ মোট ২২,২৮২ জনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে সেনাবাহিনী।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করে অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তার নির্দেশনার মূল লক্ষ্য দুটি: প্রশাসনকে আশ্বস্ত করা যে সেনাবাহিনী তাদের সব প্রয়োজনে পাশে আছে। সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে আস্থা তৈরি করা।
“বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। সেনাপ্রধান স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করব। আমাদের সঠিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই জনগণ নিরপেক্ষতার প্রমাণ পেয়ে যাবে।” — ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে। এছাড়া দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে নির্বাচনী সরঞ্জাম ও কর্মকর্তাদের পরিবহনে সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দ্রুত সাড়াদানের (Quick Response) জন্য বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে আগে থেকেই হেলিকপ্টার মোতায়েন থাকবে।
সবশেষে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচারকে নির্বাচনের বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে সেনাবাহিনী গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছে। তারা জানিয়েছে, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যেকোনো ডিজিটাল অপচেষ্টা রুখতেও সেনাবাহিনী তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করছে।

















