যুক্তরাষ্ট্রের টানা ষষ্ঠ দিনের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান পাল্টা আঘাত করেছে। ফলে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গত জুনে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুরু হওয়া এই সংঘাত শুক্রবার আরও তীব্র হয়েছে।
জুন মাসের শান্তি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। মার্কিন প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করে। সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালী এখন অবরুদ্ধ। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে।
ইরানে মার্কিন বাহিনীর টানা ষষ্ঠ রাতের আগ্রাসন
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও যুদ্ধজাহাজ থেকে ইরানের ডজনখানেক সামরিক ঘাঁটিতে নিখুঁত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। ইরানের উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটি, লজিস্টিক অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল বলে দাবি তাদের।
বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, চাবাহার ও বন্দর-এ-খামির এলাকায় ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটে। এরমধ্যে বন্দর-এ-খামির এলাকার দুটি সেতু, একটি রেলস্টেশন এবং ইরানশাহর বিমানবন্দর লক্ষ্য করে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ হামলায় অন্তত ৭ জন নিহত এবং ৯ জন আহত হয়েছেন। চলমান এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনায় ইরানের পাল্টা হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে নতুন করে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে, তারা বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও কাতারে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা সফলভাবে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দফতর অবস্থিত বাহরাইনে কয়েক দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা তাদের আকাশসীমায় ইরান থেকে আসা ৪টি ক্ষেপণাস্ত্র রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে।
তেহরানের হুঁশিয়ারি ও পরবর্তী বৈশ্বিক হুমকি
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ বা বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত করে, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সমস্ত মার্কিন অবকাঠামোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।’
এদিকে, মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে লোহিত সাগরে তেল পরিবহনের পথ অবরুদ্ধ করতে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে তেহরান। হুথিরা এই নির্দেশ কার্যকর করলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি এক জরুরি বুলেটিনে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমায় আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার উচ্চ ঝুঁকির কারণে বেসামরিক বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা জারি করেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষই যেভাবে হামলা জোরদার করছে, তাতে অতি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান না এলে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে একটি অনিয়ন্ত্রিত ও পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।