বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষভাবে পরিচালিত বলে উল্লেখ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। সংস্থাটি বলেছে, এবারের নির্বাচন গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে প্রেস ব্রিফিংয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রাথমিক বিবৃতি উপস্থাপন করেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও ইইউ ইওএমের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য টমাস জদেখভস্কির নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল মিশনের এই বিবৃতিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।
মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস বলেন, ‘২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচন ছিল বিশ্বাসযোগ্য এবং দক্ষভাবে পরিচালিত, যা গণতান্ত্রিক শাসন ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই ঐতিহাসিক নির্বাচন ছিল প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, যেখানে মৌলিক স্বাধীনতাগুলো সামগ্রিকভাবে সম্মানিত হয়েছে। নির্বাচনী আইনগত কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে কাজ করেছে, অংশীজনদের আস্থা বজায় রেখেছে এবং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা জোরদার করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনে জনআস্থা পুনর্গঠনে নাগরিক পর্যবেক্ষক, ফ্যাক্ট-চেকার, যুব ও নারী কর্মীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কার্যক্রম স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করেছে এবং ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।’
ইইউ পর্যবেক্ষকরা বলেন, ভোটগ্রহণের দিন ছিল সুশৃঙ্খল, উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ। দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনকর্মীরা ভোটগ্রহণ, কেন্দ্র খোলা ও গণনা প্রক্রিয়া দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন।
সব পর্যায়ে দলীয় এজেন্টদের উপস্থিতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ফলাফল হালনাগাদ ও গণমাধ্যমে তা প্রচার জনআস্থা ধরে রাখতে সহায়ক হয়েছে। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণ সবক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, নারীদের জন্য সীমিত রাজনৈতিক পরিসর তাদের সমান অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এছাড়া, বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ও ভুয়া তথ্যপ্রসূত গণআক্রমণের আশঙ্কা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ইতিবাচক ব্যবস্থা না থাকায় আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে কম প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে।
ইভার্স ইজাবস বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ক্রমবিকাশ আর পরিপক্বতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পুরোনো চর্চাগুলো পরিহার করে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা জোরদারে নতুন পথচলা শুরু করার সময় এসেছে।’
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রতিনিধিদলের প্রধান টমাস জদেখোভস্কি বলেন, ‘দেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। আমরা নতুন সংসদ ও সরকারকে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় গৃহীত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানাই।’
২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। নির্বাচনের দিন মিশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড থেকে আসা মোট ২২৩ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দেশের ৬৪টি জেলায় দায়িত্ব পালন করেন।
মিশনটি নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখবে এবং আগামী মাসগুলোতে ভবিষ্যৎ নির্বাচন উন্নয়নে সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।