ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বৈধতা দিয়ে একটি বিতর্কিত বিল পাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কট্টরপন্থি ও চরম দক্ষিণপন্থী নেতাদের চাপে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়াটি বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
২০২২ সালে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকার গঠনের অন্যতম শর্ত ছিল এই মৃত্যুদণ্ড বিলটি। ইসরাইলের কট্টরপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির শুরু থেকেই এই বিলের পক্ষে জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিলেন। গত বছরের নভেম্বরে বিলটি প্রথম পাঠে পাস হয় এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে এর ভয়াবহ বিধানগুলো জনসমক্ষে আসে। বিলে বলা হয়েছে, দণ্ডাদেশ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে কোনো আপিল ছাড়াই ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।
ফিলিস্তিনি লেখক মোহাম্মদ আল-কিক এক নিবন্ধে দাবি করেছেন, এসব ফিলিস্তিনিদের সাধারণ 'বন্দি' বলার চেয়ে 'যুদ্ধবন্দি' বলা বেশি যুক্তিযুক্ত। কারণ, সামরিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কারণে বা কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে। তথ্যানুসারে, বর্তমানে ইসরাইলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনিদের এক-তৃতীয়াংশই ‘প্রশাসনিক আটক’ অবস্থায় রয়েছেন, যার মধ্যে নারী ও শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত। এই বন্দিদের বিচার করা হয় সামরিক আদালতে, যা দীর্ঘকাল ধরেই পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযুক্ত।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইলি কারাগারগুলোতে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। লেখক আল-কিকের মতে, নির্যাতন, অনাহার এবং চিকিৎসার অবহেলা এখন চরমে পৌঁছেছে। গত কয়েক মাসেই অন্তত ৮৮ জন ফিলিস্তিনি বন্দি অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন। আল-কিক তার নিজের অভিজ্ঞতায় জানান, ১০ বছর আগে তাকেও কোনো অভিযোগ ছাড়া আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল, এমনকি আন্তর্জাতিক রেড ক্রসকেও তার সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
নিবন্ধকারের মতে, ফিলিস্তিনিদের ওপর এই পদ্ধতিগত নিপীড়ন জেনেভা কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় 'সন্ত্রাসবাদ দমনের' দোহাই দিয়ে ইসরাইলের দখলদারিত্ব এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলোকে বছরের পর বছর উপেক্ষা করেছে। এই আন্তর্জাতিক উদাসীনতাই ইসরাইলকে এমন কঠোর ও অমানবিক আইন করার সাহস জুগিয়েছে।
যদি এই বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হয়, তবে তা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর জন্য এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে বিলটি অতীতের ঘটনার ক্ষেত্রেও কার্যকর করার (Retroactive) সম্ভাবনা থাকায় বর্তমানে কারাগারে থাকা হাজার হাজার বন্দির জীবন হুমকির মুখে পড়বে। লেখক সতর্ক করেছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি কেবল ‘নিন্দা’ বা ‘সংযম প্রদর্শনের’ মতো দুর্বল বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ইসরাইল এই গণ-মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথে হাঁটবেই। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরাইলের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং অপরাধের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক আদালতে জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।