ফরিদপুরের প্রধান অর্থকরী ফসল পেঁয়াজ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা। হাড়ভাঙা খাটুনি আর ধারদেনা করে ফলানো পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে এবং ত্রুটিপূর্ণ সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে ক্ষোভে-দুঃখে নিজেদের উৎপাদিত ফসল ডোবা ও পুকুরের পানিতে ফেলে দিচ্ছেন তারা।
রবিবার (২৮ জুন) ফরিদপুরের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলায় এমন মর্মস্পর্শী চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবিবার সকালে সালথা উপজেলার খোয়ার গ্রামের কৃষক দাউদ মাতুব্বর তিন মণ পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে গিয়ে দাম দেখে চরম হতাশ হন। বর্তমানে বাজারে প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়, অথচ প্রতিমণ পেঁয়াজের উৎপাদন খরচই ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকা। এই বিপুল লোকসান সইতে না পেরে তিনি রাগে ও দুঃখে পেঁয়াজ বিক্রি না করে গ্রামের একটি ডোবায় ফেলে দেন। একই দিন বিকেলে উপজেলার জয়কাইল এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী তার বাড়ির পুকুরে প্রায় ৩৫০ মণ পচা পেঁয়াজ ফেলে দেন।
তার অভিযোগ, সরকারিভাবে দেওয়া ‘এয়ারফ্লো মেশিন’ ব্যবহার করার পরও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করায় এবং তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তার বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকরা জানান, বর্তমানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে, যা দিয়ে কোনোভাবেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। অতিরিক্ত গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে ঘরের হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজগুলো দ্রুত পচে যাচ্ছে।
কৃষক আবুল মাতুব্বর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কৃষকের এই দুর্দশায় কোনো কার্যকর সরকারি উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আগামীতে ন্যায্যমূল্য না পেলে এই অঞ্চলের অনেক কৃষকই পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন। উল্লেখ্য, ফরিদপুর জেলায় বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আবাদ হয়ে থাকে সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে। প্রতি বছরের মতো এবারও বিপুল উৎপাদন হলেও ন্যায্য দাম ও সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষকদের পুরোপুরি লোকসান গুনতে হচ্ছে। যার কারণে অনেকেই ক্ষোভে ও প্রতিবাদে বস্তাভরে পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছেন।
এই সংকট নিরসনে সরকারি উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তা দিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ১৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে এবং চলতি বছর বিতরণ করা হয়েছে আরও ৭০০টি। এছাড়া আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংরক্ষণ সুবিধা পুরোপুরি বাড়ানো সম্ভব হলে ভবিষ্যতে কৃষকদের আর এমন কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হবে না। তবে সাধারণ কৃষকদের দাবি, শুধু মেশিন বিতরণ করলেই হবে না, পেঁয়াজ রক্ষা করতে হলে সবার আগে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।