প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘কনভার্টিবল টাকা অ্যাকাউন্ট’ বা ‘রূপান্তরযোগ্য টাকা হিসাব’ নামে নতুন একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই বিশেষ হিসাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে প্রবাস থেকে জমা করা মূল অর্থ এবং এর বিপরীতে অর্জিত সুদ বা মুনাফা সম্পূর্ণভাবে কোনো ঝামেলা ছাড়াই আবার বিদেশে ফেরত (প্রত্যাবাসন) নেওয়া যাবে।
আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বৈধ বা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, দেশে প্রবাসীদের বিনিয়োগ জোরদার এবং ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই এই নতুন সুবিধা চালু করা হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে দেশের ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে এই ‘অনিবাসী রূপান্তরযোগ্য টাকা হিসাব’ খুলতে পারবেন।
প্রবাসীরা চাইলে এই ব্যবস্থার অধীনে চলতি (কারেন্ট), সঞ্চয়ী (সেভিংস) কিংবা স্থায়ী আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট) হিসাব পরিচালন করতে পারবেন। এই অ্যাকাউন্টে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ছাড়াও অন্যান্য অনিবাসী হিসাব থেকে স্থানান্তরিত অর্থ, অর্জিত সুদ, দেশে কোনো বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় এবং শেয়ার সাবস্ক্রিপশনের ফেরত আসা অর্থ জমা করা যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, এই হিসাবে জমা হওয়া অর্থ প্রবাসীরা যেমন যেকোনো সময় বিদেশে নিয়ে যেতে পারবেন, ঠিক তেমনি দেশের ভেতরে স্থানীয়ভাবেও ব্যবহার করতে পারবেন। স্থানীয় ব্যবহারের ক্ষেত্রে—প্রয়োজনীয় ব্যক্তগত বা ব্যবসায়িক পেমেন্ট, অন্যান্য অনিবাসী অ্যাকাউন্টে ফান্ড ট্রান্সফার, বিদেশি মুদ্রা অ্যাকাউন্টে রূপান্তর এবং বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বা শেয়ার বাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগের কাজে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে।
এ ছাড়া এই অ্যাকাউন্টে জমাকৃত তহবিল ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন বিশেষায়িত অঞ্চলের (যেমন- ইপিজেড বা ইজেড) ‘টাইপ-এ’ তথা শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় মুদ্রায় (টাকায়) ঋণ দেওয়া যাবে। তবে এই ঋণ শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত চলতি ব্যয়—যেমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, মজুরি এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধের জন্য ব্যবহার করা যাবে। এই ঋণের টাকা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আয় থেকে পরিশোধ করতে হবে।
সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রবাসীদের এই অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ব্যাংকের স্থানীয় বা ডমেস্টিক ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে প্রবাসীরা নিজেরা অথবা তাদের মনোনীত ব্যক্তিরা (নমিনি) ঋণ সুবিধা নিতে পারবেন। প্রাপ্ত ঋণ ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা গেলেও কৃষি, প্ল্যান্টেশন এবং আবাসন (রিয়েল এস্টেট) খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এই অর্থ বাংলাদেশে অ-প্রত্যাবাসনযোগ্য বিনিয়োগ কিংবা নিজস্ব ব্যবহারের জন্য আবাসিক সম্পত্তি ক্রয়ে ব্যবহার করা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই নতুন হিসাব ব্যবস্থা রেমিট্যান্সের আর্থিক মধ্যস্থতাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমকে গতিশীল করবে। এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দেশীয় বিনিয়োগে অংশগ্রহণের একটি চমৎকার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার পাশাপাশি বিশেষায়িত অঞ্চলের শতভাগ বিদেশি মালিকানার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর টাকার তারল্য সংকট মেটাতে বড় ভূমিকা রাখবে।