বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব মাহদী হাসানের দিল্লি সফর এবং সেখান থেকে আকস্মিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে নানা গুঞ্জন চললেও, এর নেপথ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অত্যন্ত কঠোর ও নীতিগত অবস্থান কাজ করেছে। মূলত তিনটি প্রধান কারণে মাহদী হাসানকে ভারতের মাটিতে অবস্থান করতে দিতে রাজি ছিল না দেশটির সরকার। প্রথমত, ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, মাহদী হাসান বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে ভারত-বিদ্বেষী ও অবমাননাকর বক্তব্য দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে পুড়িয়ে মারার যে দাবি তিনি ভিডিওতে করেছিলেন, তার ভিত্তিতে তাকে একজন 'সন্দেহভাজন অপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত করেছে ভারত। তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি ছিল সাম্প্রদায়িক স্পর্শকাতরতা। মাহদী হাসান একজন হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে (এসআই সন্তোষ চৌধুরী) পুড়িয়ে মারার যে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর মনে হয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষায়, "ভারত-বিরোধী কথা বলে এবং একজন হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার প্রকাশ্য দাবি করে—এমন কোনো ব্যক্তিকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না।"
ঘটনার সূত্রপাত হয় মঙ্গলবার সকালে দিল্লির কনট প্লেসের একটি ভিসা সেন্টারে, যেখানে মাহদী হাসান পর্তুগালের ভিসার আবেদন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে একজন সাধারণ আবেদনকারী তাকে চিনে ফেলেন এবং তার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরপরই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মাহদী হাসানের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি শুরু করে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, মাহদী যেভাবেই ভারতীয় ভিসা সংগ্রহ করে থাকুন না কেন, তার পরিচয় এবং পূর্বের ভিডিও রেকর্ডগুলো সামনে আসার পর মঙ্গলবার রাতেই তার ভিসা বাতিল করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ভারতীয় কর্মকর্তাদের মূল বার্তা ছিল পরিষ্কার—যিনি প্রতিবেশী দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে নিয়ে অমানবিক মন্তব্য করেন এবং ভারতের প্রতি ঘৃণা ছড়ান, তাকে দিল্লিতে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব নয়।
মঙ্গলবার সারাদিন দিল্লিতে মাহদী হাসানকে মানসিক চাপের মধ্যে রাখা হয়। অজ্ঞাত নম্বর থেকে বারবার ফোন আসা এবং কোনো আশ্রয়ের সন্ধান না পাওয়া তাকে এটি বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, তার জন্য ভারত আর নিরাপদ নয়। পরদিন বুধবার সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে যাওয়ার পর ইমিগ্রেশন ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তারা তাকে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে জেরা করেন। সেখানে কোনো শারীরিক নিগ্রহ করা না হলেও তাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে, নিজের দেশে ফিরে যাওয়া ছাড়া তার অন্য কোনো বিকল্প নেই। মূলত আইনি জটিলতা বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো কূটনৈতিক সংকট এড়াতে তাকে গ্রেফতার না করে দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কৌশল গ্রহণ করে ভারত সরকার। বুধবার দুপুরে তাকে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তুলে দেওয়ার মাধ্যমেই দিল্লিতে মাহদী হাসানের নাটকীয় সফরের সমাপ্তি ঘটে।