দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী, পাপেট চর্চার পথিকৃৎ ও অনন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার মারা গেছেন। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিউমোনিয়া, ফুসফুসে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ এবং প্রোস্টেট ক্যানসারের মতো বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।
ফুসফুসে গুরুতর ইনফেকশন ও রক্তচাপ কমে যাওয়ায় গত ১৪ জুন তাঁকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে দ্রুত তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে লাইফ সাপোর্টে থাকার পর আজ সকালে এই গুণী শিল্পী চিরবিদায় নেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ তাঁর মরদেহ ধানমন্ডির বাসভবনে রাখা হবে। মঙ্গলবার সকালে বিটিভি প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হবে এবং বনানী কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হবে।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন: ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার পুত্র। কলকাতার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে তিনি শিক্ষা জীবন শেষ করেন।
শিক্ষকতা ও প্রশাসন: কর্মজীবনের শুরুতে তিনি তৎকালীন চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাবি) প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
পাপেট ও শিশুতোষ সৃষ্টি: বাংলাদেশে পাপেট বা পুতুলনাচের বিকাশ ও প্রসারে তিনি ছিলেন প্রধান রূপকার, যার কারণে তাঁকে ‘পাপেটম্যান অব বাংলাদেশ’ বলা হয়। বিটিভির জনপ্রিয় শিশুতোষ নতুন প্রতিভার অন্বেষণমূলক অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’, পাপেট শো ‘মনের কথা’ এবং কার্টুন চরিত্র ‘মীনা’র নেপথ্যের কারিগর ছিলেন তিনি।
জাতীয় অবদান: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেওয়া মুস্তাফা মনোয়ার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লালরঙের সূর্যের প্রতিরূপ পরিকল্পনার অন্যতম স্থপতি ছিলেন। শিল্পকলা ও সংস্কৃতিতে অনন্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০৪ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।
শোকের ছায়া: কালজয়ী এই শিল্পস্রষ্টার প্রয়াণে দেশের শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী রফিকুন নবীসহ বহু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও তাঁর গুণগ্রাহীরা।