দেড় বছরে ভারত, চীন ও রাশিয়া দেয়নি নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরের কার্যকালে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পরিচিত তিনটি প্রধান দেশ—ভারত, চীন ও রাশিয়া থেকে নতুন কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি মেলেনি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে এই তিন দেশ কোনো নতুন প্রকল্পের জন্য ঋণচুক্তি করেনি। মূলত দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আগের সরকারের নেওয়া কিছু প্রকল্পের ব্যয় ও মান নিয়ে বর্তমান সরকারের সতর্ক অবস্থানের কারণে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, নতুন প্রতিশ্রুতি না মিললেও এই তিন দেশ তাদের পুরোনো ও চলমান প্রকল্পগুলোর আওতায় অর্থছাড় অব্যাহত রেখেছে। গত দেড় বছরে ভারত, চীন ও রাশিয়া সব মিলিয়ে ২ বিলিয়ন (২১৭ কোটি) ডলারের বেশি অর্থছাড় করেছে। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের জন্য রাশিয়া সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলার ছাড় করেছে। অন্যদিকে, চীন তাদের চলমান প্রকল্পগুলোর বিপরীতে ছাড় করেছে প্রায় সাড়ে ৬৩ কোটি ডলার। ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে ছাড় হয়েছে ২৯ কোটি ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিপক্ষীয় ঋণের বিষয়টি দেশগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এ বিষয়ে বলেন, শুরু থেকেই ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক ধরনের শীতলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়েছে ঋণের প্রতিশ্রুতিতে। এছাড়া বিগত সরকারের আমলে নেওয়া কিছু বড় প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে বড় কোনো ঋণের চুক্তিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ রক্ষণশীল ও সতর্ক ভূমিকা পালন করছে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে নতুন কোনো লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) নিয়ে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না। চীনের ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মান ও উচ্চ ব্যয় নিয়ে আগে থেকেই সমালোচনা থাকায় নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রাশিয়ার সঙ্গেও আপাতত নতুন কোনো প্রকল্পে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই সরকারের। তবে দ্বিপক্ষীয় এই দেশগুলো থেকে নতুন প্রতিশ্রুতি না এলেও বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং জাপানের মতো বহুজাতিক ও দ্বিপক্ষীয় দাতা সংস্থাগুলো তাদের ঋণের প্রতিশ্রুতি ও সহায়তা স্বাভাবিক রেখেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই (জুলাই-ডিসেম্বর) এই সংস্থাগুলো থেকে ১৯৯ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ।
বর্তমানে ভারতের তিনটি এলওসির আওতায় নেওয়া ৩৬টি প্রকল্পের মধ্যে ১৫টি শেষ হয়েছে এবং ৮টি চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পর্যালোচনার পর ভবিষ্যতে এই দেশগুলোর সঙ্গে ঋণের গতি আবারও বাড়তে পারে। তবে আপাতত টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সরকার কেবল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোতেই গুরুত্ব দিচ্ছে।

















