ঠাকুরগাঁওয়ের নীলকান্ত-গীতা দম্পতির রূপকথার ২৫ বছর

শৈশব থেকেই সমাজের বাঁকা চাহনি আর কটু কথা ছিল নীলকান্তের নিত্যসঙ্গী। উচ্চতায় খাটো হওয়ায় সমবয়সীদের ভিড়ে নিজেকে বড্ড একা মনে হতো তার। প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন—অনেকের অবজ্ঞা নীরবে সয়েছেন তিনি। কিন্তু সেই অবজ্ঞা তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। জীবনের প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এগিয়ে চলাই ছিল তার লক্ষ্য। যদিও পারিবারিক সীমাবদ্ধতায় এসএসসি পরীক্ষার চৌকাঠ পেরোনো হয়নি, তবুও জীবনযুদ্ধে তিনি হার মানেননি।
নীলকান্তের জীবনের সেই ধূসর অধ্যায়ে নতুন রঙের ছোঁয়া লাগে যখন তার পরিচয় হয় গীতা রাণীর সঙ্গে। গীতাও নীলকান্তের মতোই খর্বকায় এবং আজন্ম জীবনসংগ্রামী। উচ্চতার সীমাবদ্ধতা আর সমাজের অবহেলা—এই মিলগুলোই তাদের দুজনকে একে অপরের খুব কাছে নিয়ে আসে। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, আর সেই বন্ধুত্ব রূপ নেয় গভীর ভালোবাসায়। চারপাশের মানুষের কানাঘুষা আর নেতিবাচক মন্তব্যকে উপেক্ষা করে ২৫ বছর আগে তারা শুরু করেন ঘরকন্না। আজ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের জোতপাড়া গ্রামের এই দম্পতি এলাকার মানুষের কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময়ের দাম্পত্য জীবনে অভাব-অনটন কখনোই তাদের বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেনি। বরং প্রতিটি কঠিন মুহূর্ত তাদের সম্পর্ককে করেছে আরও শক্তিশালী। তাদের কোল আলো করে আসা একমাত্র মেয়েকে বড় করে বিয়েও দিয়েছেন এই দম্পতি। নীলকান্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “ছোটবেলা থেকে মানুষ আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। কিন্তু গীতাকে পাওয়ার পর আমি বুঝতে পেরেছি, পৃথিবীতে আমি একা নই। জীবনসঙ্গী হিসেবে সে আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা যখন একসঙ্গে থাকি, তখন কোনো কষ্টই আর কষ্ট মনে হয় না।”
একই সুর প্রতিধ্বনিত হয় গীতা রাণীর কণ্ঠেও। তিনি বিশ্বাস করেন, স্বামী-শ্রীর সম্পর্ক কেবল সুখের দিনে পাশে থাকার নাম নয়। গীতা বলেন, “আমাদের সংসারে অনেক টানাপোড়েন ছিল, দিনের পর দিন অভাবের সাথে যুদ্ধ করেছি। কিন্তু আমরা কখনো একে অন্যকে দোষারোপ করিনি। বরং দুঃখটাকে ভাগ করে নিয়েছি। একে অপরের প্রতি সম্মান আর বিশ্বাসই আমাদের এতদিন টিকিয়ে রেখেছে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও নীলকান্ত-গীতা দম্পতি ভালোবাসার এক মূর্ত প্রতীক। প্রতিবেশী স্কুলশিক্ষিকা সাবিত্রী রাণী জানান, বাহ্যিক অবয়বে তারা খাটো হলেও মনের দিক থেকে তারা অনেক উচ্চতায়। তাদের মধ্যে কোনোদিন কোনো বড় বিবাদ দেখা যায়নি। তারা প্রমাণ করেছেন যে, একে অপরের পরিপূরক হতে গেলে শারীরিক সৌন্দর্যের চেয়ে হৃদয়ের মিল অনেক বেশি জরুরি। গ্রামের সাধারণ মানুষ এখন তাদের এই হার না মানা মানসিকতাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন।
২৫ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও বদলায়নি তাদের মধ্যকার পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধা ও মায়া। সমাজের চোখে তারা হয়তো ‘ভিন্ন’ কিংবা ‘অপূর্ণ’, কিন্তু নিজেদের নিভৃত ভুবনে তারা একে অপরের কাছে পরিপূর্ণ। নীলকান্ত ও গীতা রাণীর এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দাম্পত্যের আসল ভিত্তি কোনো সামাজিক অবস্থান বা শারীরিক গঠন নয়; বরং তা হলো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর সহমর্মিতা। প্রতিকূলতার সাগরে ভাসমান মানুষের কাছে ঠাকুরগাঁওয়ের এই দম্পতি আজ ভালোবাসার এক সার্থক বাতিঘর।

















