ট্রাম্পের নজর গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ ও ভূ-রাজনীতিতে !

গ্রিনল্যান্ডের প্রতি নিজের দীর্ঘদিনের আগ্রহকে এবার এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, দ্বীপটির প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং এর বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মার্কিন অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি ভবিষ্যৎ চুক্তির ‘কাঠামো’ তৈরি করেছেন তিনি। যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে একে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র বিষয় হিসেবে দেখছেন, বিশ্লেষকদের মতে এর আসল লক্ষ্য হলো গ্রিনল্যান্ডের বিরল খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
২০২৩ সালের ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, ইউরোপীয় কমিশনের তালিকাভুক্ত ৩৪টি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মধ্যে ২৫টিই (যেমন: গ্রাফাইট, নিওবিয়াম ও টাইটানিয়াম) গ্রিনল্যান্ডে মজুত রয়েছে। আধুনিক ইলেকট্রনিকস, সবুজ শক্তি এবং সামরিক প্রযুক্তির জন্য এই কাঁচামালগুলো অপরিহার্য। বর্তমানে এই খাতে চীনের যে একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে, তা মোকাবিলা করাই ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন ল্যামি মনে করেন, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পেছনে ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য হলো খনিজ সম্পদের নাগাল পাওয়া এবং এই বাজারে চীনের একাধিপত্য খর্ব করা।
গত বুধবার দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ট্রাম্প বলেন, “আমি গ্রিনল্যান্ড চাই শুধু নিরাপত্তার জন্য—অন্য কিছুর জন্য নয়।” তিনি সেখানে খনিজ উত্তোলনের কঠিন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, ২৫ ফুট বরফের নিচে গিয়ে খনিজ আহরণ করা সবার কাজ নয়।
তবে ট্রাম্পের এই ‘নিরাপত্তা’ তত্ত্বের আড়ালে অর্থনৈতিক স্বার্থই যে প্রধান, তা স্পষ্ট হয়েছে লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রির বক্তব্যে। তিনি ট্রাম্পকে একজন ‘ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার জন্য একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক সুযোগ।
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে গত কয়েক বছরে ওয়াশিংটন বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে: ২০২০ সালে রাজধানী ন্যু-তে পুনরায় মার্কিন কনস্যুলেট খোলা হয়। গত গ্রীষ্মে গ্রিনল্যান্ডের একটি খনি প্রকল্পে ১২ কোটি ডলার অর্থায়নের অনুমোদন দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়ালৎস জানান, এটি শুধু জ্বালানি নয়, বরং মহাকাশ ও শত্রুদের ওপর নজরদারির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে বিশাল স্বপ্ন থাকলেও বাস্তবতা বেশ কঠিন। অবকাঠামোর অভাব, শ্রমিক সংকট এবং চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেখানে খনি পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ডেনিশ গবেষক মিকেল রুঞ্জ ওলেসেনের মতে, অতিরিক্ত খরচের কারণে গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে হিমশিম খেয়েছে।
তবে আশার আলো দেখাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। বরফ দ্রুত গলতে শুরু করায় খনিজ উত্তোলনের পথ যেমন সহজ হচ্ছে, তেমনি নতুন সমুদ্রপথ উন্মোচন ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, চ্যাথাম হাউসের গবেষক প্যাট্রিক শ্রডার যেমনটা বলেছেন, এই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বৈশ্বিক রাজনীতিতে ‘পাশার দান উল্টে দেওয়ার’ মতো ক্ষমতা রাখতে পারে।


















