টি-২০ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের ব্রায়ান বেনেট যেন দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি রান করা ব্যাটারদের তালিকায় বেনেট শীর্ষ পাঁচেও নেই। স্ট্রাইক রেটও আহামরি কিছু নয়। তবে বেনেট এমন জায়গায় অনন্য, যেখানে রান তোলায় শীর্ষ দশে তার মতো আর কেউ নেই। তিন ম্যাচ খেলা বেনেটকে কেউ এখনো আউট করতে পারেননি! সর্বোচ্চ রান তোলা শীর্ষ ১০ ব্যাটসম্যানের তালিকায় ষষ্ঠ বেনেটের ব্যাটিং গড় তাই অসীম!
জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারে থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরের অঞ্চল গোরোমঞ্জি। তিন বা চার বছর বয়সে যমজভাই ডেভিডের সঙ্গে সেখানেই প্রথম ক্রিকেট ব্যাট হাতে নেওয়া তার। খেলতেন যমজ ভাই ডেভিড এবং সর্বকনিষ্ঠ ভাই শনের সঙ্গে।
তাদের জন্য বাবা বাসায় নেট অনুশীলনের জায়গা তৈরি করে দিয়েছিলেন। এ কারণে স্কুল থেকে ফিরে তাদের সময়টা নেটেই কাটতো। তাদের বাবা কেলি বেনেট জিম্বাবুয়ের ক্লাব ক্রিকেটার ছিলেন। ইয়াং ম্যাশোনাল্যান্ড ক্লাবের হয়ে বেশ কয়েকটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচও খেলেছেন কেলি। ডেভ হটন, হিথ স্ট্রিক ও ফ্লাওয়ার ভাইদের সঙ্গে ক্লাব ক্রিকেটেও খেলেছেন।
সেই কেলি এখন ব্লুবেরি চাষ করেন। ডেভিডও জড়িয়েছেন তামাক চাষে। ক্রিকেটটা তার পরিবারেই ছিল, সেটা বেনেট বললেন বাবার উদাহরণ টেনে, ‘তিনি জাতীয় দলে খেলেননি। কিন্তু জিম্বাবুয়ে অনূর্ধ্ব–১৯ দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন আর ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন।’
সেই হিসেবে কেলির এই সন্তানটি কিন্তু বাবার পথে তাকে ছাড়িয়ে গেছেন।
কেলির মতো বেনেট এবং ডেভিডও খেলেছেন জিম্বাবুয়ে অনূর্ধ্ব–১৯ দলে। শুধু খেলেছেন কী, ২০২২ অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের হয়ে সর্বোচ্চ রানের গৌরবটা ব্রায়ান বেনেটের (৬ ম্যাচে ২৭৩), দুইয়ে তারই ভাই ডেভিড বেনেট (৬ ম্যাচে ২২২)।
জিম্বাবুয়ের পিটারহাউস স্কুলে লেখাপড়া করেছেন দুই ভাই। সেখানেও ক্রিকেট বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গ্যারি ব্যালান্স এবং রায়ান বার্ল এই স্কুল থেকেই উঠে এসেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কিংসউড কলেজের ক্রিকেট উৎসবে নিয়মিত অংশ নিতেন পিটারহাউস স্কুলের শিক্ষার্থীরা। কোভিড-১৯ এর সময় শেষ দুই বছরে বেনেটের স্কুলের লেখাপড়া আর নিয়মিত হয়নি।
বাবা তাই কিংসউড কলেজে ভর্তি করেন দুই ছেলেকে। সেখানে প্রথম ম্যাচেই ব্রায়ান বেনেট ঝড় তুলেছিলেন। ওয়ারিয়র্সের সাবেক এই পেসার তখন সেখানে কোচিং করাতেন। বার্চ বলেন, ‘১০০ বলে ১৫১ করে সে একদম ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছিল। ভয়ডরহীন এবং শর্ট বলে খুব ভালো। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছি তার সাফল্যক্ষুধা দেখে। অল্প বয়সে প্রতিভা অনেকেরই থাকে, কিন্তু ক্ষুধাটা বিরল।’
অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপ খেলে আসার পরের বছর জিম্বাবুয়ের হয়ে টি–টুয়েন্টিতে অভিষেকের সুযোগ পান ব্রায়ান বেনেট। কিন্তু ডেভিডের আর ক্রিকেটার হয়ে ওঠা হয়নি। ব্রায়ান ২০২৪ সালে বাকি দুই সংস্করণেও অভিষিক্ত হন। পরের বছর ট্রেন্ট ব্রিজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে করেন জিম্বাবুয়ের হয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরি (৯৭ বল)। সেটি ছিল তার সপ্তম টেস্ট। ব্রায়ানের ক্যারিয়ার মূলত এরপরই পাখা মেলতে শুরু করে।
এবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে সম্ভবত সেটারই চূড়ান্ত রূপ দেখা যাচ্ছে। ওমানের বিপক্ষে ৪৮*, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬৪* ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৬৩*। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়। শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া যে গ্রুপে আছে, সেখানে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন জিম্বাবুয়ে!
কিন্তু বেনেটকে দেখে তা বোঝা গেছে কতটা? গতকাল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও ফিফটি করার পর তেমন একটা উচ্ছ্বাস দেখাননি। সতীর্থ সিকান্দার রাজাকে শুধু জড়িয়ে ধরেছেন। বেনেট আসলে নিভৃতে নিজের কাজটা করতেই পছন্দ করেন। জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক রাজা যেমন কাল বললেন, ‘ম্যাচের পর ম্যাচ সে এটা (পারফর্ম) করে যাচ্ছে। কৃতিত্বটা তাকে দিতেই হবে।’
শ্রীলঙ্কাকে হারানোর এই ম্যাচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই জিম্বাবুয়ের সেই সোনালি প্রজন্মের প্রসঙ্গ তুলে আনেন। নব্বই দশকের শেষ দিকে সেই যে নিল জনসন, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার, অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল, হিথ স্ট্রিকদের দলটি। ব্রায়ান বেনেট কি তবে এই দলে নিল জনসন, নাকি ক্যাম্পবেল? জিম্বাবুয়ের ডেভেলপমেন্ট কোচ ইয়ান টিংকার অবশ্য তা মনে করেন না, ‘সে অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেলের মতো নজরকাড়া নয়। অনেকটাই ব্রেন্ডন টেলরের মতো। এই বয়সে তারা দুজনেই একই রকম।’
বেনেট তো সবে ২২ বছরের। এখনো সামনে লম্বা পথ। সেই পথের দৌড়ে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বেনেট এখনো অপরাজিত, হারেনি জিম্বাবুয়েও।