২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন নিহতের সংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) দেওয়া তথ্যকে ‘অত্যন্ত ভুল’ বলে চ্যালেঞ্জ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতীয় ইংরেজি গণমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বারসের আইনজীবী স্টিভেন পাউলস কেসির মাধ্যমে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্ককে শেখ হাসিনা একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন।
গত ২৮ মে পাঠানো ওই চিঠিতে আইনজীবী পাউলস দাবি করেছেন, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টে ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা বিভ্রান্তিকর ও অতিরঞ্জিত। চিঠিতে বলা হয়, ‘এমনকি খোদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত ১৫ জানুয়ারি, ২০২৫-এ প্রকাশিত অফিশিয়াল গেজেটেও নিহতের সংখ্যা ৮৩৪ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা জাতিসংঘের দাবিকৃত সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নিজস্ব হিসেবে এই সংখ্যা ছিল ৬৫০ জন।’
শেখ হাসিনার আইনি দলের অভিযোগ, এই অতিরঞ্জিত নিহতের সংখ্যাকে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। চিঠিতে দাবি করা হয়, এই সংখ্যাকে বড় করে দেখিয়ে শেখ হাসিনাকে একজন ‘গণহত্যাকারী’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা তার সরকার উৎখাতের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান অজুহাত ছিল।
আইনজীবী পাউলস তার চিঠিতে জাতিসংঘের এই তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই তদন্তটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছিল। চিঠিতে ড. ইউনূসের পূর্বের একটি মন্তব্যকে উদ্ধৃত করা হয়, যেখানে তিনি আন্দোলনটিকে একটি ‘সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল অপারেশন’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আইনজীবীর মতে, এমন একটি সরকারের অধীনে পরিচালিত তদন্ত নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়।
এনডিটিভির খবরে স্টিভেন পাউলস কেসি নামে যে আইনজীবীর কথা বলা হয়েছে এবং যে চিঠির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা দেশের অন্যান্য গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে যাচাই করতে না পারলেও, এনডিটিভি লিখেছে যে তারা চিঠিটি সংগ্রহের পর তা পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করেছে। তবে এই ধরনের চিঠি জাতিসংঘ কতটা আমলে নেবে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি।
পাউলস কেসি এবং তার চেম্বার বাংলাদেশের ২০২৪ পরবর্তী সহিংসতা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও জাতিসংঘে আগেও আবেদন করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মহলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাপক আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের একটি অভ্যন্তরীণ ট্রাইব্যুনাল (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) তাকে এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। শেখ হাসিনার আইনজীবীরা শুরু থেকেই এই বিচার প্রক্রিয়াকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করে আসছেন।
চিঠির শেষ অংশে পাউলস জাতিসংঘকে এই ‘ভুল তথ্য’ সংশোধন করে একটি প্রকাশ্য বিবৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে জাতিসংঘ কোনো ‘মিথ্যা বয়ান’ প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। তবে এখন পর্যন্ত ওএইচসিএইচআর-এর পক্ষ থেকে এই চিঠির কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়া হয়নি।