আজ ১৯ মে। বাঙালির ভাষা আন্দোলনের অমর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র রচয়িতা, বিশিষ্ট সাহিত্যিক, প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরীর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২২ সালের এই দিনে (১৯ মে) লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৮ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম ও সাংবাদিকতার ইতিহাসের অন্যতম এই পুরোধা ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ দিবসে তাঁর কর্মময় জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
আবদুল গাফফার চৌধুরী ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ই ডিসেম্বর বরিশালের উলানিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
তাঁর কর্মজীবন ছিল এক বিশাল ক্যানভাস। ছাত্রাবস্থায় ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ‘সওগাত’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প ছাপা হয়। এর পর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন কাগজে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের পথচলা শুরু। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের ‘মাসিক সওগাত’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিযুক্ত হন তিনি। এ সময় তিনি ‘মাসিক নকীব’ এবং আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘দিলরুবা’ পত্রিকারও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ‘দৈনিক ইত্তেফাক’–এর সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। একই বছর তিনি প্যারামাউন্ট প্রেসের সাহিত্য পত্রিকা ‘মেঘনা’র সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজনৈতিক পত্রিকা ‘চাবুক’–এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। সামরিক শাসনামলে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি মওলানা আকরম খাঁর ‘দৈনিক আজাদ’–এ সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দৈনিক ‘জেহাদ’–এর বার্তা সম্পাদক এবং ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে অবজারভার গ্রুপের দৈনিক ‘পূর্বদেশ’–এ যোগ দেন।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর তাঁর লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি তাঁকে দেশজোড়া ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। গানটির একটি ঐতিহাসিক দিক হলো— প্রথমে তিনি নিজেই এই গানটিতে সুর করেছিলেন। পরবর্তীতে শহীদ আলতাফ মাহমুদ গানটিতে নতুনভাবে সুরারোপ করেন এবং এই সুরেই এখন গানটি বিশ্বজুড়ে গাওয়া হয়। বিবিসি বাংলা বিভাগের শ্রোতা ও দর্শকদের জরিপে এই গানটি বাংলা গানের ইতিহাসে সর্বকালের তৃতীয় সেরা গানের মর্যাদা পেয়েছে।
একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আবদুল গাফফার চৌধুরী কলকাতায় গিয়ে ‘জয় বাংলা’, ‘যুগান্তর’ ও ‘आनন্দবাজার’ পত্রিকায় কাজ করেন এবং প্রবাসী সরকারের মুখপত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর, ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ অক্টোবর তিনি সপরিবারে লন্ডনে চলে যান। প্রবাসে থেকেও দেশের টানে তিনি সেখানে ‘নতুন দিন’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং আমৃত্যু ঢাকা ও কলকাতার বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে নিয়মিত রাজনৈতিক কলাম লিখে গেছেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন বহু গ্রন্থের জনক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে আবদুল গাফফার চৌধুরী একটি ঐতিহাসিক ডকু-ড্রামা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যার নাম ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডি’। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ওপর ‘দ্য পোয়েট অব পলিটিকস’ নামে আরেকটি চলচ্চিত্র তিনি প্রযোজনা করেন।
কাজের অনন্য স্বীকৃতির জন্য জীবনে অসংখ্য বড় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক, ইউনেস্কো সাহিত্য পুরস্কার এবং রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পদক (২০০৯)।
২০২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মে লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই মহানায়কের জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তীতে তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ দেশে এনে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে সমগ্র জাতি তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে।