পবিত্র ঈদুল আজহা এলেও আনন্দের বদলে দীর্ঘশ্বাস, অভাব আর অনিশ্চয়তাই সঙ্গী হয়েছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী বাসিন্দাদের। উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হলেও, দীর্ঘ ৯ বছর ধরে নিজভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন লাখো রোহিঙ্গার জীবনে উৎসবের সেই চিরচেনা আবহ আর নেই। বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার অনেকেই এবারও ঈদ কাটিয়েছেন চরম হতাশার মধ্য দিয়ে।
গত বছরের রমজানে কক্সবাজারের কুতুপালং শিবিরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে এক ইফতার অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাশে রেখে আশার বাণী শোনানো হয়েছিল যে, 'আগামী ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ দেশে করতে পারবে।' সেই আশ্বাসে বুক বেঁধেছিলেন শরণার্থীরা। উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা দিল মোহাম্মদ আক্ষেপ করে বলেন, “গত বছর বলা হয়েছিল ২০২৬ সালের ঈদ আমরা নিজ দেশ মিয়ানমারে উদযাপন করবো। কিন্তু এবারও কাঁটাতারের ভেতরেই বন্দী হয়ে ঈদ কাটাতে হচ্ছে।” এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি তো হয়ইনি, উল্টো নতুন করে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।
ঈদ এলেও শরণার্থী শিবিরগুলোতে এবার উৎসবের আমেজ ছিল একেবারেই ম্লান। টেকনাফের লেদা শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, “কোরবানির ঈদ হলেও আমাদের ক্যাম্পে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের মাংস সহায়তা পাওয়া যায়নি। টানা তিন বছর ধরে এ ধরনের সহায়তা বন্ধ রয়েছে। মিয়ানমারে আমাদের বাপ-দাদার কবর রয়েছে, সেখানে ঈদের নামাজ শেষে জিয়ারত করতাম। এখন আর সেই সুযোগ নেই। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?”
রেশন কমে যাওয়া ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে পেটের ভাত জোগানোই এখন প্রধান যুদ্ধ। টেকনাফের মৌচনী ক্যাম্পের বাসিন্দা সৈয়দ আলম বলেন, “থাকা-খাওয়ার যে অবস্থা, সেখানে ঈদের কথা ভাবার সুযোগই নেই। ছেলেকে নতুন জামা কিনে দিতে পারিনি। পেটের খাবার জোগাড় করাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা।”
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান তহবিল সংকটের কথা স্বীকার করে জানান, আশ্রয়শিবিরে কর্মরত বিভিন্ন এনজিও বর্তমানে তীব্র ফান্ড সংকটে ভুগছে। এ কারণে এবার কোরবানির পশুর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। গত বছর পরিবারপ্রতি দেড় কেজি করে মাংস বিতরণ করা হলেও, এবার উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে থাকা দুই লাখ রোহিঙ্গা পরিবারে মাত্র এক কেজি করে মাংস বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, “রোহিঙ্গাদের ঈদ মানেই এখন বিষাদের ঈদ। নিজভূমিতে ঈদ উদযাপনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্যাম্পগুলোতে তীব্র হতাশা তৈরি হয়েছে।”
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের মুখে পালিয়ে আসা এই শরণার্থী জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা এখন একটাই—আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকায় নিজভূমি আরাকানে নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে ফিরে যাওয়া।