কর্মী কল্যাণ তহবিলের বকেয়া দাবি বিষয়ক মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভারতে ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের মুনাফা প্রেরণের বিষয়ে বিধি নিষেধ আরোপের দাবি জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তন কর্মীরা।
এ লক্ষ্যে প্রাক্তন কর্মীদের সংগঠন এক্স-ম্যারিকোনিয়ান অ্যাসোসিয়েশন সোমবার (৩ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বরাবর পৃথক আবেদন জমা দিয়েছে। আবেদনে প্রাক্তন কর্মীদের কল্যাণ তহবিলের পাওনা সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির আগ পর্যন্ত কোম্পানির লভ্যাংশ ও মুনাফা বিদেশে পাঠানোর অনুমোদন বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও পাওনা পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ম্যারিকো লিমিটেড, ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিক। বাংলাদেশ থেকে অর্জিত মুনাফার একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে মূল কোম্পানির কাছে লভ্যাংশ ও মুনাফা হিসেবে প্রেরণ করা হলেও, একই সময়ে বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী প্রাক্তন কর্মীদের দাবিকৃত কর্মী কল্যাণ তহবিলের দাবি সংক্রান্ত পাওনা দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ করা হয়নি।
বাংলাদেশ শ্রম আইন- ২০০৬ অনুযায়ী প্রাক্তন কর্মীদের বকেয়া ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড ও ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ড এর দাবি সংক্রান্ত মামলা আদালতে বছরের পর বিচারাধীন রয়েছে। মামলাগুলো নিষ্পত্তি না করেই বিদেশে বিপুল পরিমাণ মুনাফা ও লভ্যাংশ পাঠানোর অভিযোগে ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের বিষয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন কোম্পানির প্রাক্তন কর্মীরা।
প্রাক্তন কর্মীদের অভিযোগ, ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৪ সালে আইন অনুযায়ী কর্মী কল্যাণ তহবিল গঠন করলেও তা কেবল ২০১৩–১৪ অর্থবছর থেকে বাস্তবায়ন করে। ফলে ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কর্মরত শ্রমিকরা বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২৩৪ ও ২৪০(৩) অনুযায়ী প্রাপ্য মুনাফার অংশ থেকে বঞ্চিত হন। বিষয়টি সমাধানের জন্য কোম্পানির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ দাবিতে ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের ৯৪ জন প্রাক্তন কর্মী ঢাকার ১ম শ্রম আদালতে (ঢাকা বিএলএ (৮৬৫/২০২৫) মামলা দায়ের করেছেন। একই বিষয়ে এর আগে ১৯ জন প্রাক্তন কর্মী (বিএলএ ৬৯১/২০১৪) মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার গ্রহণযোগ্যতা চ্যালেঞ্জ করে ম্যারিকো লিমিটেড হাইকোর্ট ডিভিশনে (৫৭৬/২০১৮ নম্বর) রিট পিটিশন দায়ের করেন, যা অদ্যাবধি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এর ২৪০ (৩) ধারার বিধানের আলোকে স্বনামধন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব এবং কোম্পানির ২০২৫–২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কেবল উক্ত ৯৪ জন আবেদনকারীর কর্মী কল্যাণ তহবিলের বকেয়া সঞ্চিত মুনাফার পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১,৪৮১ কোটি টাকা। এর বাইরে একই ধরনের দাবিদার আরও প্রাক্তন কর্মী রয়েছেন।
প্রাক্তন কর্মীদের ভাষ্য, একদিকে তাদের আইনগত পাওনা বছরের পর বছর পরিশোধ না করা, অন্যদিকে কোম্পানি গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ হারে নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে বিদেশে মুনাফা পাঠাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, শ্রমিকদের আইনগত দাবি সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির আগে কোম্পানির সম্পদ বিদেশে স্থানান্তর অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আদালতের রায় তাদের পক্ষে এলেও পাওনা আদায়ের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
এ কারণে আবেদনকারীরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে বিদেশে মুনাফা বা লভ্যাংশ পাঠানোর আগে কর্মী কল্যাণ তহবিলের পাওনা সংক্রান্ত বিচারাধীন আইনগত দায় বিবেচনায় নেওয়া, শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যবস্থা গ্রহণ, সম্ভাব্য দায় পরিশোধ নিশ্চিত করতে কোম্পানিকে পর্যাপ্ত রিজার্ভ ফান্ড সংরক্ষণের নির্দেশ প্রদান এবং শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মীদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
এক্স-ম্যারিকোনিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, তাদের উদ্দেশ্য কোনো বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা নয়। বরং আদালতে শ্রমিকদের আইনগত পাওনা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দেশের প্রচলিত শ্রম আইন, জনস্বার্থ এবং ন্যায্যতার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাদের অধিকার নিশ্চিত হওয়া।