ইরানে বিক্ষোভ: ট্রাম্পের হাতে খামেনিকে তাড়ানোর কলকাঠি!

গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলা থেকে দেশটির রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করে মার্কিন সেনারা। এরপর থেকে চিন্তা ভর করেছে ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্র ইরানের ওপর।
এদিকে ভেনেজুয়েলায় হামলার সপ্তাহখানেক আগে তেহরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। ইরানে মার্কিন ডলারের দাম আরও বেড়ে যাওয়ায় প্রথমে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। পরে, এতে যোগ দেয় সর্বস্তরের মানুষ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গত ১০ দিনের বিক্ষোভে ইরানে অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও ২ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। আহত হয়েছেন ৬০ জনের বেশি। গ্রেফতার হয়েছে কমপক্ষে ২ হাজার ৭৬ জন। ইরানের ৩১ প্রদেশের মধ্যে ২৭টিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সরকার নিহতদের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ না করলেও তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৩ সদস্য নিহতের খবর জানাচ্ছে।
চলমান বিক্ষোভের মধ্যে সরকার আলোচনার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি জনগণকে অর্থনৈতিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘ইসরায়েলি ও মার্কিন চরের’ তকমা দিয়ে তাদের দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনগুলো বলা হয়েছে।
ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন টার্গেট?
এদিকে, ইরানে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। দুই দেশ গত বছর জুনে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরুর পর নতুন বছরের ৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, ইরান সরকার যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে থাকে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের উদ্ধারে ব্যবস্থা নেবে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল বলেছে যে তাদের লোকজন ইরানে আছে। প্রয়োজনে তারা বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করবে। ট্রাম্পের সহায়তা আশ্বাসের পরদিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে জানান যে, ইরানের জনগণের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে তিনি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।
স্বভাবতই, ইরানের শাসকবিরোধী বিক্ষোভে এই দুই দেশের শীর্ষ নেতার সমর্থনকে তেহরান তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ইরান সরকার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, বিদেশি রাষ্ট্রের এমন হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। কিন্তু, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সেনাদের হস্তক্ষেপ যেন তেহরানের সব হুঁশিয়ারিকে ‘হালকা’ করে দিয়েছে।
গত ৩১ ডিসেম্বর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ ডিসেম্বর ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দাম এতটাই পড়ে যায় যে, সেদিন এক ডলারের বিনিময়ে রিয়াল ছিল ১৪ লাখ ২০ হাজার। গত ৬ মাসে রিয়ালের দাম ৫৬ শতাংশের বেশি কমেছে। শুধু তাই নয়, গত বছরে একই সময়ের তুলনায় ইরানে খাবারের দাম বেড়েছে গড়ে ৭২ শতাংশ।
কোথায় যাবেন খামেনি?
ইরানের বিক্ষোভকারীরা তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের দুষছেন। তাদের দাবি, সরকারের অব্যবস্থাপনা তাদের দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসকদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে শাসনব্যবস্থা পালটে ফেলার দাবি তুলছেন।
বিক্ষোভকারীরা তাদের প্রধান নেতা আলি খামেনির বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে, ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানায়, ‘আয়াতুল্লাহ খামেনি মস্কো পালানোর পরিকল্পনা করছেন’।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তেহরান থেকে পালানোর পথ নিয়ে পরিকল্পনা করেছেন। তার নিরাপত্তা বাহিনী যদি জনক্ষোভ প্রশমনে ব্যর্থ হয় তাহলে তিনি মস্কোর পথে উড়াল দেবেন।
বিশ্লেষকদের বিশ্বাস, বর্তমান বিশ্ব-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরানি নেতাদের আশ্রয়ের জন্য রাশিয়াই এখন একমাত্র দেশ। তাদের মতে, ইরানের আয়াতুল্লাহ রাশিয়ার শাসক ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশংসা করেন। রুশ সংস্কৃতির সঙ্গে ইরানি সংস্কৃতির মিল আছে। দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে ইরানি নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি রাশিয়াকেই প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেবেন।
দ্য টাইমসের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট জানায়, পালানোর সময় আলি খামেনির সঙ্গে পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক সহযোগীদের মধ্যে ২০ জন যেতে পারেন। এই দলে খামেনির ছেলে ও উত্তরাধিকার মোজতবা থাকবেন।
তবে এই সিদ্ধান্তকে ‘দ্বিতীয় ভাবনা’ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


















