আন্তর্জাতিক অপরাধী পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের (Interpol) ওয়েবসাইটে বিশ্বজুড়ে মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি হিসেবে বর্তমানে ৬ হাজার ৪৪২ জনের তালিকা রয়েছে, যার মধ্যে ৫৯ জনই হলেন বাংলাদেশি অপরাধী। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ আটক হওয়ার পর এই তালিকাটি নতুন করে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত আসামির প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হলেও কৌশলগত কারণে সব আসামির নাম ওয়েবসাইটের প্রকাশ্য তালিকায় প্রকাশ করা হয় না। সাবেক আইজিপি বেনজীরের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। তাঁর নামে রেড নোটিশ জারি হলেও তা ওয়ান্টেড তালিকায় দৃশ্যমান করা হয়নি, যাতে আসামি বিষয়টি জানতে পেরে গা-ঢাকা দেওয়ার সুযোগ না পায়। তবে এই গোপন রেড নোটিশটি ইন্টারপোলের সদস্যভুক্ত প্রায় সব দেশের নিরাপত্তা সংস্থার নিজস্ব নেটওয়ার্কে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ইন্টারপোলের প্রকাশ্য তালিকায় থাকা ৫৯ জন বাংলাদেশিকে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন অপরাধের দায়ে বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ খুঁজছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশ ছাড়াও ভারত, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও বেলজিয়াম রয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অপরাধ ও খুনের দায়ে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো যেসব বাংলাদেশির সন্ধান চাইছে, তাদের মধ্যে খুনের অভিযোগে চাঁদপুর সদরের রাজু ঢালীকে খুঁজছে সিঙ্গাপুর; আফ্রিকার দেশ ইসওয়াতানি খুঁজছে ঢাকার মো. মিলন ও লিটন ব্যাপারীকে; নোয়াখালীর মিজান মিয়াকে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং লক্ষ্মীপুরের খোরশেদ আলমকে খুঁজছে ইউরোপের দেশ বেলজিয়াম। এছাড়া ফেনীর আলা উদ্দিনকে খুনের অভিযোগে এবং নাটোরের সিরাজ মোস্তফাকে চোরাচালানির অভিযোগে খুঁজছে মালয়েশিয়া।
মুদ্রা জালিয়াতির অভিযোগে ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছেন খুলনার আজিজুর রহমান, অজয় বিশ্বাস ও তরিকুল ইসলাম; নোয়াখালীর সবুজ, গোপালগঞ্জের আব্দুল আলীম শরীফ, নারায়ণগঞ্জের মনির ভূঁইয়া এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শফিক উল। অর্থ তছরুপের অভিযোগে হানিফকে খুঁজছে মালদ্বীপ। অন্যদিকে, যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে জাহিদুল ইসলামকে এবং অস্ত্র মামলায় ফজলুল আমীন জাভেদকে হন্যে হয়ে খুঁজছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA)।
অন্যদিকে গুরুতর অপরাধ, হত্যা ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার ইন্টারপোলের মাধ্যমে যাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, তাদের মধ্যে হত্যা মামলার আসামি হিসেবে রয়েছেন বাগেরহাটের রবিউল ইসলাম, টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ তাজউদ্দীন ও বাবু আহমেদ রাতুল, চট্টগ্রামের ইউসুফ ও সাজ্জাদ হোসেন খান, ফরিদপুরের নাইম খান ইকরাম, বগুড়ার কালা জাহাঙ্গীর ফেরদৌস, গাজীপুরের নুরুল দীপু ও আহাম্মেদ মজনু, কুমিল্লার খন্দকার আব্দুর রশীদ ও রাশেদ চৌধুরী, ঢাকার নুর চৌধুরী, নবী হোসাইন, জিসান আহমেদ, তৌফিক আলম, প্রকাশ কুমার, জাফর আহমেদ, সালাউদ্দিন মিন্টু, নাজমুল আনসার, শরীফুল হক ডালিম, খুলনার শরীফুল হোসাইন, চট্টগ্রামের আমিনুর রসুল, নেত্রকোনার আব্দুল জাব্বার, বরিশালের গোলাম ফারুক অভি, মুন্সীগঞ্জের রফিকুল ইসলাম, খুলনার হারুন শেখ, নরসিংদীর মোসলেম উদ্দিন খান, গাইবান্ধার চন্দন কুমার রায় এবং জাহিদ হোসেন খোকন, সৈয়দ মো. হাছান আলী, আবুল কালাম আজাদ ও সৈয়দ মো. হোসেন। এছাড়া মানবপাচারের অভিযোগে কিশোরগঞ্জের জাফর ইকবাল, স্বপন, মিন্টু মিয়া ও তানজীরুল এবং মাদারীপুরের মোল্লা নজরুল ইসলামকে খুঁজছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি পর্নোগ্রাফির অভিযোগে টাঙ্গাইলের ওয়াসিম, অস্ত্র মামলায় গিয়াস উদ্দিন, নির্যাতনের মামলায় চট্টগ্রামের অশোক কুমার দাশ এবং জালিয়াতির অভিযোগে জামালপুরের আমানুল্লাহ শফিক ও আতাউর রহমানকে খুঁজছে বাংলাদেশ সরকার। উল্লেখ্য, ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক এই অপরাধী পুলিশ সংস্থা বা ইন্টারপোলের বর্তমান সদস্য সংখ্যা বিশ্বের ১৯৬টি দেশ, যা বিশ্বজুড়ে অপরাধ দমন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের পুলিশ এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞদের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে থাকে।