দ্রুততম সময়ের মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়াও দেশটিতে আরও বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পেরদানা পুত্রায় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি কর্মী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছেন। তাদের এই অবদান আমাদের উভয় দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে সমৃদ্ধ করছে। আমি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে এবং যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি মালয়েশিয়ায় অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিত (বৈধ) করা এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভব হলে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, কর্মী নিয়োগপ্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও সাশ্রয়ী হয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে খরচ কমানো যায় সে বিষয়ে দুপক্ষ একমত হয়েছে।
আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেছি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুতে মতবিনিময় করেছি। আমরা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি। যৌথ কমিশন বৈঠক এবং আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাসহ বিদ্যমান কাঠামোগুলোর মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়াতে আমরা একমত হয়েছি।’
দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতেও দুই দেশ সম্মত হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম যাদের ফোন পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম অন্যতম। তিনি বলেন, তিনি আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এবং মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পেরে আমি সম্মানিত। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম বিদেশ সফরে এখানে আসতে পেরে আমি ও আমার স্ত্রী আনন্দিত।
উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, সরকার ও জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশের একটি বিশ্বস্ত ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পারস্পরিক আস্থা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যকার দৃঢ় সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের এই বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।’
দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সংবাদ সম্মেলনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন সেরি পেরদানা কমপ্লেক্সে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। দুই দেশের গভীর বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ এই আয়োজনে মালয়েশিয়ার প্রখ্যাত শিল্পীদের বাংলা ও মালয় ভাষায় গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়।
এর আগে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা গভীর করতে তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে একান্ত বৈঠক হয়। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পেরদানা পুত্রায় এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক।
এদিন সকালে স্থানীয় সময় ৯টার দিকে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে পেরদানা পুত্রায় পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেন আনোয়ার ইব্রাহিম।
আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী দাতুক সেরি ডা. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তার স্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান এবং কুশলবিনিময় করেন। এরপর তারেক রহমানকে লালগালিচা দিয়ে আনুষ্ঠানিক চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মালয়েশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর একটি দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। এ সময় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সম্মান জানান এবং বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জাতীয় সংগীত বাজানো হয়।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দুই দিনের সরকারি সফরে রোববার রাতে কুয়ালালামপুরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।