আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, সুন্দরবন দিবস। ২০০১ সালে খুলনায় অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলনে এই দিনটিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকেই উপকূলীয় জনপদে পরম মমতায় পালিত হয়ে আসছে দিনটি। ভালোবাসা দিবসের রঙিন আবহে আমাদের মানচিত্রের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা এই বনভূমির প্রতি ভালোবাসার দাবি আজ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সুন্দরবন কেবল একটি বন নয়; এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়াল, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার উৎস এবং বিরল জীববৈচিত্র্যের আধার। তবে আজকের এই দিনে আনন্দের চেয়ে উদ্বেগের পাল্লাই ভারী, কারণ নানামুখী সংকটে বিপন্ন এই বিশ্ব ঐতিহ্য।
বিগত কয়েক দশকে সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস এবং সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় রিমাল—প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন নিজের বুক পেতে দিয়ে বাংলাদেশের উপকূলকে রক্ষা করেছে। বনের গাছপালা বাতাসের গতিবেগকে কমিয়ে দেয় আর বিশাল ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটা সামলে নেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবন না থাকলে এসব দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি হতো। অথচ যে বন আমাদের জীবন বাঁচায়, সেই বনই এখন জলবায়ু পরিবর্তনের মরণকামড়ে ক্ষতবিক্ষত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লোনা পানি বনের গভীরে ঢুকে পড়ছে, যা এই বনের বাস্তুসংস্থানকে ওলটপালট করে দিচ্ছে।
সুন্দরবনের প্রধান গাছ সুন্দরি ও পশুর। এই গাছগুলো টিকে থাকার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ মিষ্টি পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু উজানের নদীগুলো থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এবং সমুদ্রের লোনা পানির অনুপ্রবেশ বাড়ায় গাছগুলো ‘আগামরা’ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বনের দক্ষিণ অংশে লোনা পানির তীব্রতা এতই বেড়েছে যে, সেখানে অনেক গাছপালা মরে গিয়ে ন্যাড়া ভূমিতে পরিণত হচ্ছে। মিষ্টি পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে সুন্দরবনের এই অনন্য বৈশিষ্ট্য চিরতরে হারিয়ে যাবে, যা বনের পুনরুৎপাদন ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সুন্দরবনের চারপাশের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ECA) গড়ে ওঠা অসংখ্য শিল্পকারখানা বনের জন্য ‘টাইম বোমা’ হিসেবে কাজ করছে। সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, এলপিজি প্ল্যান্ট এবং বিভিন্ন রাসায়নিক কারখানার বর্জ্য সরাসরি পশুর নদী ও সংলগ্ন খালে মিশছে। এছাড়া বনের বুক চিরে জাহাজ চলাচল করায় তেলের আস্তরণ নদীর পানিতে মিশে শ্বাসমূল ঢেকে দিচ্ছে। এর ফলে বনের জলজ প্রাণী, বিশেষ করে ডলফিন ও কুমিরের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণ এখন সুন্দরবনের গভীর অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে, যা বনের মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে।
সুন্দরবনের প্রাণ হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। কিন্তু চোরা শিকারিদের দাপটে এবং বাসস্থানের সংকটে বাঘের সংখ্যা আজ হুমকির মুখে। হরিণ শিকার ও বাঘের চামড়া পাচারের খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে উঠে আসে। যখন বনে খাদ্যের অভাব দেখা দেয় বা লোনা পানির কারণে মিষ্টি পানির পুকুর শুকিয়ে যায়, তখন বাঘ লোকালয়ে চলে আসে। এর ফলে মানুষ ও বাঘের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা অনেক সময় বাঘের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া অসাধু জেলেদের নালা ও খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার পুরো জলজ বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর এবং সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, বনের সীমানার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে সব ধরনের ক্ষতিকর শিল্পকারখানা বন্ধ করতে হবে। বনের ভেতর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত করে বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গঙ্গা ও অন্যান্য সংযোগ নদী থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে যাতে বনের লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তৃতীয়ত, বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্মার্ট পেট্রোলিং এবং ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে চোরাশিকারিদের সমূলে নির্মূল করতে হবে। সুন্দরবন রক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
সুন্দরবন কেবল সরকারের একার চেষ্টায় বাঁচানো সম্ভব নয়। বনের ওপর নির্ভরশীল বাওয়ালি, মৌয়াল ও জেলেদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা বনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে। পর্যটকদের জন্য ‘জিরো প্লাস্টিক’ নীতি এবং কঠোর আচরণবিধি নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ শব্দে মাইক বাজানো বা বনের ভেতরে বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। পর্যটন হতে হবে প্রকৃতিবান্ধব, যা বনের ক্ষতি না করে মানুষকে সচেতন করবে।
সুন্দরবন দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই বনটি আমাদের জাতীয় গর্ব এবং অস্তিত্বের অংশ। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসার এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত সুন্দরবনকে রক্ষার। যদি সুন্দরবন ধ্বংস হয়, তবে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে উপকূলীয় জেলাগুলো হারিয়ে যাবে এবং আমরা হারাবো আমাদের সেরা প্রাকৃতিক ঢাল। আসুন, সুন্দরবনকে ভালোবাসি, এর সম্পদ রক্ষা করি এবং আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও নিরাপদ সুন্দরবন রেখে যাই। সুন্দরবন বাঁচলে, বাঁচবে বাংলাদেশ—এই স্লোগান যেন কেবল দিবসেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে স্থান পায়।