নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তার দলের দেয়া প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা হবে। শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমান আরও বলেছেন, ‘রাষ্ট্র মেরামতের যে রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল এবং সারাদেশের জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছিল। ৩১ দফার আলোকে ঘোষণা করা হয়েছে দলীয় ইশতেহার।
‘একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছে। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব ইনশাআল্লাহ।’
তারেক রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে দেশের জনগণ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছেন। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছেন, এবার জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজের মাধ্যমে জনগণের এই বিশ্বাস এবং ভালোবাসার প্রতিদান দিতে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
‘এবার আমি সারা দেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলতে চাই—শত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তো সংগ্রামে অটুট ছিলেন, অনড় ছিলেন। এবার দেশ গড়ার পালা আমাদের। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় আপনি-আমি- আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে অবশ্যই।’ যোগ করেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই বিজয়কে শান্তভাবে, শান্তির সাথে, দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে উদযাপন করেছি। নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে যাতে কোথাও কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, এজন্য শত উস্কানির মুখেও আমি সারা বাংলাদেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের শান্ত এবং সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’
‘কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য নির্বাচনোত্তর নিরঙ্কুশ জয়ের অর্জনের পরও আমি সারাদেশে বিএনপি এবং জোটভুক্ত দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিজয় মিছিল বের করতে নিষেধ করেছিলাম। আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে বিজয় উৎসব পালন করেছি।’
‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই একমাত্র সমাধান’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমার বক্তব্য স্পষ্ট- যেকোনো মূল্যে অবশ্যই শান্তি এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ড আমরা বরদাশত করব না। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ কিংবা ভিন্নমত যাই থাকুক, কোনো অজুহাতে অবশ্যই দুর্বলের ওপরে সবলের আক্রমণ আমরা মেনে নেব না।’
দেশ পরিচালনায় ন্যায়পরায়ণতাই হবে আদর্শ মন্তব্য করেন করেন তিনি। বলেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্ন মত—প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যই আইন সমান। আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে। নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ, প্রতিহিংসার রূপ না নেয়- সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য আমি আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাচ্ছি।’

আগামীর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, যেভাবে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ভূমিকা রেখেছিলাম, একইভাবে এবার দুর্নীতি এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, মানবিক বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য যে যার অবস্থান থেকে আমরা ভূমিকা রাখি। একটি নিরাপদ, মানবিক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে আমি ভিন্ন দল কিংবা ভিন্ন মতের সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।’
‘সরকার হবে জবাবদিহিমূলক’
নতুন সরকারের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি-এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি। আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশে পুনরায় জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।’
‘ঐক্যবদ্ধ থাকতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আর কোনও অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে, দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে; সেজন্য আমরা সকলে ইনশাআল্লাহ ঐক্যবদ্ধ থাকব এবং থাকতে হবে।’ যোগ করেন বিএনপি প্রধান।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তা-ভাবনা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ এবং মত ভিন্ন থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।’
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা।